গ্রন্থ সমালোচনা- তরুণ লেখক সামসুল আমিনের ভাবনার প্রতিবিম্ব

মতিয়ার চৌধুরী
কোন গ্রন্থের উপর আলোচনা সমালোচনা করতে হলে বা এ বিষয়ে কিছু বলতে হলে, তাঁকে হতে হয় বড় কোন সাহিত্যিক বা সমালোচক। আমি কিন্তু এসবের কোনটাই নই। আমার লিখাটি একজন সচেতন পাঠকের প্রতিক্রিয়া বা ব্যক্তিগত উপলব্দির বহিঃপ্রকাশ মাত্র। আর আজকের আলোচনার বিষয় বস্তু নবপ্রজন্মের একজন তরুণ কলম সৈনিক সামসুল আমিন রচিত বিশ্লেষণধর্মী গ্রন্থ ‘ভাবনার প্রতিবিম্ব’। মহামূল্যবান এই প্রন্থটির প্রকাশকাল ফাল্গুন ১৪১৯, ফেব্রুয়ারী ২০১৩ ঈসায়ী। প্রকাশক দিয়া প্রকাশ সিলেট, প্রচ্ছদ ও পরিকল্পনা অনন্ত বিজয় দাস। মুদ্রণ প্যারাডাইম অফসেট প্রেস রাজা ম্যানশন দ্বিতীয়তলা জিন্দাবাজার সিলেট। গ্রন্থখানির মূল্য ধরা হয়েছে মাত্র ১৪০ টাকা। লেখক গ্রন্থখানি উৎসর্গ করতে গিয়ে সাধক ফকির লালন শাহের একটি গানের  উদৃতি দিয়ে অপশক্তি এবং সাম্প্রদায়িকতাকে ইঙ্গিত করে বলেছেন-  
খাাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।
ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখির পায়।।
                মৌলবাদীদের কূপমন্ডুকতা আর বর্বর হামলায় ভাঙ্গা হয়নি শুধূ লালন ভাষ্কর্য
               ক্ষতবিক্ষত আর রক্তাক্ত হয়েছে অসাম্প্রদায়িক বাঙলির জাতিসত্ত্বার চেতনা…………..
মূলত আমাদের  অসাম্প্রদায়িক চেতনা, সভ্যতা সংস্কৃতি ও কৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতেই লেখক গ্রন্থখানি উৎসর্গ করেছেন। তাইতো গ্রন্থকার তার অবতরণিকা বা লেখকের কথায় লিখেছেন ‘কাগজের গায়ে কালির আঁচড়  বসিয়ে ফুটাতে চেয়েছি নিজের অব্যক্ত কথামালা। কখনোবা ভাললাগা বিষয়কে তুলে ধরেছি নিজের ভাবনা কল্পনায় আর কখনোবা অস্থির সমাজ- রাজনীতির পরিক্রমায় ক্ষুদ্ধ হয়ে বর্ণিত করেছি নিজের দুঃখবোধ।’
শুধু লেখক কেন আমরা যারা স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িকতা লালন করি সকলেরই জিজ্ঞাসা দেশ কি ধর্মান্ধতা এবং সাম্প্রদায়িক অপশক্তির কাছে জিম্মি? এই গ্রন্থে লেখক বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ, প্রচলিত আইন, মানবতাবোধ এবং বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, দার্শনিক এবং বৈজ্ঞানিকদের মতামত এবং চিন্তা ভাবনার বিশ্লেষন তুলে ধরেছেন। তিনি গ্রন্থে তার নিজের মতামত ব্যক্ত নাকরেও আমাদের জন্যে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন।
অফসেট পেপারে মুদ্রিত ৬৩ পৃষ্ঠার এই মূল্যবান গ্রন্থখানিতে লেখকের অনুভূতি সহ দশটি অধ্যায় স্থান পেয়েছে এর মধ্যে রয়েছে মাওলানাঃ শাদ্বিক অর্থের ব্যবহার, জিন প্রসঙ্গঃ ধর্মীয় অন্ধ বিশ্বাস ও সামাজিক কুসংস্কার, চাঁদ দেখার বিভ্রান্তিঃ ইসলামিক উৎসবের অসঙ্গতি, নারীর খতনাঃ সভ্যতার কলঙ্ক, তালাক এবং হিল্লা বিয়ের অপপ্রয়োগ, বাউল ভাস্কর্য অপসারণঃ ধর্মান্ধতার কাছে অসাম্প্রদায়িকতার পরাজয়, স্বেচ্চায় রক্তদান প্রাসঙ্গিক আলোচনা,  মরনোত্তর চক্ষুদানঃ বেঁচে থাকুন অন্যের চোঁখের আলো হয়ে, মরণোত্তর দেহদান এবং অঙ্গ সংযোজন, পাশ্চাত্য সাহিত্যিকদের আত্মহত্য ঃ দুই শতাব্দির খন্ডচিত্র।
গ্রন্থ খানির ভূমিকা লিখেছেন সম্প্রতি জঙ্গি হামালায় নিহত মুক্তমনের লেখক ছোটকাগজ যুক্তি‘র সম্পাদক বাবু অনন্ত বিজয় দাস। গ্রন্থের ভূমিকায়  সমাজ সংস্কারক লেখক অনন্ত বিজয় দাস সমাজের সঙ্গতি-অসঙ্গতির চিত্র তুলে ধরতে গিয়ে বলেছেন চিন্তাশীল প্রাণী হিসেবে বেশীরভাগ মানুষকে যুক্তিবোধ, বুদ্ধির মুক্তি কিংবা মুক্তবুদ্ধির চর্চা  খুব সহজেই কাছে টানে। মানুষের সভ্যতার পথে এগিয়ে চলার সর্বত্রই মুক্তবুদ্ধি চর্চার ফল প্রথায় আবদ্ধ এ সমাজে ক্ষমতাবানদের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করতে না পেরে যত মানুষই  মানসবন্ধিত্ব  বরণ করুক না কেন চিন্তার স্বাধীনতার সুফল প্রত্যেকেই গ্রহণ করে। তবু  যুগ যুগ ধরে মানুষের স্বাধীন চিন্তায় বাধা প্রদান করে আসছে  রাষ্ট্রশক্তি সমাজপতিরা। আমাদেরকে প্রশ্ন করতে, ভিন্নমতের ভাবনায় অনুৎসাহিত করা হয়, ভয় দেখানো হয়  উপর ওয়ালার বিরাগভাজন হওয়ার। তথাপি আমরা দেখেছি যুগে যুগে গড্ডালিকা প্রবাহে গা না ভাসিয়ে  জনগোষ্ঠীর একটা উল্লেখ যোগ্য অংশ  ¯্রােতের বিপরিতে ঋজুভঙ্গিতে দাড়াঁয়। শানিত যুক্তি-বুদ্ধির ধারালো পরশে ফলা করে ফেলে ঘুনে ধরা সমাজের এক একটি প্রথাকে। তিনি বলেছেন  সামসুল আমিনের ভাবনার প্রতিবিম্ব গ্রন্থ খানি অনুভুতি এবং গর্বের। ভাবনার প্রতিবিম্ব গ্রন্থের পাতায় পাতায়  যেমন যুক্তিবাদের কথা বলা হয়েছে, নির্মোহের সাথে অনুসদ্ধিৎসু মনকে জাগ্রত করার কথা বলা হয়েছে তেমনি মানবতাবোধকেও গুরুত্ব দেয়া হয়েছে সমান তালে। আমি গ্রন্থ খানির আদ্যান্ত পাঠ করেছি যতই পড়েছি  মুগ্ধ হয়েছি তাই অনন্ত বিজয়দাস এর বিশদ তুলে ধরেছেন মাত্র কয়েকটি লাইনে আমি তার মত এবং যুক্তির সাথে সম্পুর্ণ একমত।  আমি বলবো সামসুল আমিন বয়সে তরুন হলেও তার চিন্তা চেতনা খুবই স্বচ্ছ এবং বাস্তব মুখি। এই গ্রন্থখানি লিখতে তাঁকে সীমাহীন কষ্ট করতে হয়েছে পড়াশুনা করতে হয়েছে বিস্তর। তার জ্ঞানের পরিধি বিশাল। ভাবনার প্রতিবিম্ব লিখতে তাঁকে  বিভন্ন ধমীয় গ্রন্থ, কোরআন হাদিস, সমাজ বিজ্ঞান, মেডিকেল সাইন্স, এবং চলমান বিশ্ব সম্পর্কে প্রচুর ষ্টাডি করতে হয়েছে। বইয়ের প্রতিটি অধ্যায়ে তিনি যেসব রেফারেন্স দিয়েছেন সকলের পক্ষে তা যোগাড় করা সম্ভব নয়। এখন ক্রমান্বয়ে ভাবনার প্রতিবিম্ব গ্রন্থের অধ্যায় গুলোর প্রতি তাঁকাই।
 গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়ে মাওলানাঃ শাব্দিক অর্থ ও ব্যবহার প্রসঙ্গেঃ- লেখক কোরআন হাদিছের  উদৃতি এবং ছয়টিরও বেশী রেফারেন্স সহ এর ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন এভাবে ‘‘মাদ্রসা থেকে টাইটেল (কামিল) পাস করলেই নাকি মাওলানা  উপাধি নেয়া যায়।  কিন্তু মাওলানা শব্দের প্রকৃত অর্থ কি? তা জানা প্রয়োজন।  মাওলানা শব্দটি দুটো  আরবী শব্দ দ্বারা সন্ধিযুক্ত। একটি ‘মাওলা’, অন্যটি ‘আনা’ । ‘মাওলা’- শব্দের অর্থ আল্লাহতায়ালা, জগদীশ্বর। তিনি রেফারেন্স হিসবে বাংলা একাডেমী সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, পবিত্র কোরআন থেকে সুরা আল-ইমরানের ১৫০ নাম্বার আয়াতের ব্যাখ্যা ব্যবহার করেছেন। আল্লাহকে উদ্দেশ্য করে ‘মাওলা’ ব্যবহার তুলে ধরেছেন ‘ আল্লাহতায়াালাই হচ্ছেন তোমাদের একমাত্র অভিবাবক এবং তিনিই হচ্ছেন তোমাদের  উত্তম সাহায্যকারী।’ এর ব্যাখ্যা পরিস্কার করতে বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ হাফিজ মনির উদ্দিন আহমদের অনুবাদ তুলে ধরেছেন। ‘‘ আনা -শব্দের অর্থ আমি। অর্থাৎ মাওলানা শব্দের অর্থ দাড়ায়  আমিই আল্লাহ বা আমিই অভিবাবক।
অথবা অন্যভাবে বলা যায় ‘মাওলা’-প্রভু বা আল্লাহ এবং ‘না’ অর্থ আমার বা আমাদের অর্থাৎ মাওলানা শব্দের অর্থ প্রভু বা আল্লাহ।  পবিত্র কোরআনে অনেক আয়াত আছে যেখানে মাওলা অর্থ প্রভু। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে এর বাংলা অনুবাদ করা হয়েছে অভিভাবক অর্থে।  প্রকৃতপক্ষে ‘অলি’ অর্থ অভিবাবক। তবে লেখক তার যুক্তিকে আরো পরিস্কার করতে সুরা বাকারার (২৮৬) আয়াতের ব্যখ্যা করেছেন। -এভাবে (‘আন্তা মাওলানা ফানছুরনা আলাল কাওমীল  কাফিরিন।) এর বাংলা অর্থ হলো  তুমিই আমাদের অভিবাবক; অতএব  কাফের জাতির বিরুদ্ধে  তুমিই আমাদের সাহায্য করো।  এখানে লেখক ইসলামী বিশ্বকোষের ব্যাখ্যা তুলে ধরেছেন। ‘সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষে’ বর্ণিত আছে -মাওলাবীয়া, মেওলাবিয়্যা, মাওলাবী মেওলাবী  ইত্যাদি তুর্কি শব্দগুলো  প্রকৃত পক্ষে আরবী মাওলানা শব্দেরই রুপান্তর।  এখানে লেখক এটিকে তুর্কি মারিফতি দরবেশ দলের নাম বলে বর্ণনা দিয়েছেন (যারা নাচন কুর্দন করে ঘুরে বেড়াতো। (পৃ ১২৬, ১২৭ ২য় খন্ড)।
অন্যদিকে বাংলা একাডেমী প্রণীত অভিধানে মওলানা, মাওলানা, মৌলানা, শব্দের অর্থ দেয়া হয়েছে  আমাদের প্রভু, মহামান্য আলিম, শাস্ত্রবিশেষজ্ঞ, ইসলাম ধর্মে বিশেষজ্ঞ,  মহাজ্ঞানী আলেম হিসেবে। এব্যাপরে হাদিছে পরিস্কারভাবে  মনিবকে মাওলা  সম্বোধন করা নিষিদ্ধ করা হযেছে।  কোরআন বলছে আল্লাহর সঙ্গে অপর কোন ‘ইলাহ’ সাব্যস্থ করোনা।  করলে নিন্দিত ও লাঞ্চিত হবে। আবার তুমি আল্লাহর সঙ্গে অন্য ইলাহকে ডেকোনা । আল্লাহ সব গুনাহ মাফ করে দিতে পারেন  কিন্তু  শেরেকি গুনাহ মাফ করেন না।
ইরান পাকিস্তান আফগানিস্তান ভারত ও বাংলাদেশ ছাড়া বিশ্বের অন্য কোথাও  মাওলানা পদবিটি মানুষের নামের সঙ্গে ব্যবহারের প্রচলন নেই।  এখানে লেখক সুন্দর আরো একটি ্ উদাহরন তুলে ধরেছেন ২৪টি আরবমূলকে  আলেম সম্প্রদায়ের নামের সাথে এই পদবী ব্যবহার শেরেকি মনে করে বিধায়  সেক্ষেত্রে তারা এই মাওলা পদবীর ব্যবহার করেননা।  তবে মাওলা শব্দটির পারস্যে ফর্সি ভাষায় রয়েছে। যা আধ্যাত্যিক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এই চাপ্টারে লেখক বাংলা একাডেমীর সংক্ষিপ্ত বাংলা অভিধান, হাফেজ মনির উদ্দিন আহমদের পবিত্র কোরআনের সহজ সরল বাংলা অনুবাদ, ইসলামি বিশ্বকোষ দ্বিতীয় খন্ড, সহ মোট ছয়টি রেফারেন্স দিয়েছেন। এছাড়া এই প্রবন্ধটি ২৫ সেপ্টেম্বর ২০০৫ সালে দৈনিক শ্যামল সিলেট পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।
জিন প্রসঙ্গ- ধর্মীয় অন্ধ বিশ্বাস ও সামাজিক সুসংস্কার  অধ্যায়ে গ্রন্থকার বাংলা একাডেমী সংক্ষিপ্ত বাংলাঅভিদান, সংক্ষিপ্ত ইসলামী বিশ্বকোষ প্রথম খন্ড( ইসলামিক ফাউন্ডেশন), রচনা সমগ্র আজর আলী মাতব্বর, তফছির কুরআন (তৃতীয় খন্ড) স্যার সাঈদ আহমদ খান, তাফসির কুরআন শরীফ মাওলানা আকরম খা, তাফসির ইবনে কাসির (আমপাড়া খন্ড) ড. মুহাম্মদ মুজিবুর রহমান (অনুদিত), সত্য মিথ্যার বিচারে কিছু কথা, সা‘দ উল্লাহ Encyclopedia of Religions  and Etics (Vol-1), Dictionary of Technical Tarms সহ সেরা দশটি রেফারেন্স এবং যুক্তিসহ লিখক  কোরআন- ইঞ্জিলের ব্যাখা দিয়ে জিন ভুত এবং সামাজিক সুসংস্কার প্রসঙ্গে  বিশ্বসেরা আলেম-ওলামা এবং বিজ্ঞানীদের  মতামত তুলে ধরে বলেছেন  আরবী ‘জান্না’ বহুবচনে ‘জিন্নন’ শব্দ থেকে জিন শব্দের উৎপত্তি।  যা ইথিওপীয় ‘জানেন’ (Ganen-দানব) এর সাথে তুলনীয়। জিনের অন্যান্য আভিধানিক নাম দৈত্য,দানব অসুর প্রভৃতি।  প্রাক ইসলামী যুগে পৌত্তলিক আরবদের মধ্যে এক অশরীরী জীবের উপর প্রবল বিশ্বাস ছিল। এদের বলা হতো জিন।  ইরানে জিনকে দেইভ বলা হত। যা থেকে আরমাইক ভাষায় হল ‘দাইওয়ান’ (Daiwa)।  এটিকে তিনি ইসলামে দৈত্য-দানব এবং বিভিন্ন রুপ কথার কল্পকাহিনীতে হিন্দু ধর্মে অসুর নামটির সাথে সাদৃশ্য দেখিয়েছেন। এই অধ্যায়ে লিখক  জিন- ভুত নিয়ে ইসলামী চিন্তাবিদদের মতবিরুধ সম্পর্কে ও আলোচনা করেছেন।
চাঁদ দেখার বিভ্রান্তি ঃ ইসলামী উৎসবে অসঙ্গতি অধ্যায়ে লিখক চাঁদ দেখা এবং ধর্মীয় উৎসব,ঈদ, মর্হরম, মেহরাজ, শবেবরাত, রোজা শবেকদর  নিয়ে আলোকপাত করতে গিয়ে বলেছেন চাঁদ দেখার  বিভ্রান্তি শুরু হয়েছে একক ইসলামী রাষ্ট্র ভাঙ্গার পর। দ্বাদশ শতাব্দির পর যখন বিশ্বব্যাপী মুসলমানের সংখ্যা বাড়তে থাকে তখন থেকে মুসলিম প্রধান অঞ্চলে ঈদ রোজা ইত্যাদি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয়। ধর্মীয় কাজে অনেকটাই হয় চাঁদের উদয় অস্তের উপর নির্ভর করে। এছাড়া বিশ্বে সময়ের তারতম্যও উেেঠ এসেছে তার আলোচনায়। এই অধ্যায়ে লিখক দেওবন্দের অধ্যক্ষ হযরত মৌলানা হোসাইন আহমদ মদনী (রঃ) মুফতি মাওলানা রশিদ আহমদ গাংগুহী, শাব্বির আহমদ ওসমানী, মাওলানা আহমদ আলী সাঈদ, মৌলানা আজিজুর রহমান সহ বিশ্ব বরেন্য ওলামাদের মতামত তুলে ধরেছেন। এই অধ্যায়েও লিখক দশটিরও বেশী রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন। এসব মতামতের আলোকে লেখক বলতে চেয়েছেন পৃথিবীতে একটি মাত্র উপগ্রহ হচ্ছে চাঁদ। পৃথিবীর যে প্রান্থে চাঁদ দেখা যাবে তা বিশ্ববাসীর জন্যে প্রযোজ্য।
নারীর খতনা ঃ সভ্যতার কলঙ্ক  অধ্যায়ে গ্রন্থকার খতনা (Circumcision)‘র নৃতাত্তিক উৎস কি। মানুষ কবে থেকে এই প্রথা অনুষরন করছে এবং কিভাবে এর প্রচলন প্রসঙ্গে বলেছেন মেয়ের খতনার প্রতাটি ছেলেদের চেয়ে প্রাচীনতর। তিনি বলেছেন নারীদের অবদমনের আদিম প্রক্রিয়া হিসেবে হয়তোবা এই প্রথাটি চালু হযেছিল। পরবর্তিতে এটিকে ধর্মীয় ভাবে রুপ দেয়া হয়েছে। বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থেও খতনা সম্পর্কে কাহিনী রয়েছে।  প্রথমে ইহুদী ধর্মে, এরপর খৃষ্ট ধর্মে, পরবর্তিতে ইসলাম ধর্মেও এই প্রথাটি চালু হয়। পবিত্র বাইেবেলের ‘ওল্ড টেষ্টামেন্ট’  শুধু পুরুষদের খতনার কথা জানা যায়। মূলতঃ এই খতনা প্রথাটি এসেছে ইহুদী ধর্ম থেকে।  ইহুদী খৃষ্টান ও ইসলামে এই প্রথার মিল রয়েছে। পূর্ববর্তি এই দুই ধর্মের অনুসরনে ইসলাম ধর্মেও এই প্রথা বহাল থাকে। বাংলাদেশে মুসলমান দেয়েদের মেয়েদের খতনার সিষ্টেম না থ্কলেও মিশর, সোমালিয়া সহ  বিশ্বের বহু দেশে এখনও এই প্রথা বহাল রয়েছে। এই অধ্যায়েও লেখক বহু রেফারেন্স ব্যবহার করেছেন।
তালাক এবং হিল্লা বিয়ের অপপ্রয়োগ অধ্যায়ে গ্রন্থকার  ইসলামী শাস্ত্রে সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য অনুযায়ী স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক  একটি পবিত্র আত্মিক, সামাজিক এবং ধর্মীয় বন্ধন হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। ইসলাম ধর্মে তালাকের বিধান থাকলেও হিল্লা বিয়ের অপপ্রয়োগ সম্পর্কে গ্রন্থকার অত্যন্ত সুন্দর ভাবে কোরআর হাদিসের ব্যাখ্যা সামাজিকতা, বাস্তবতার নিরিখে এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। এই অধ্যায়ে লেখক ধর্মীয় বিধান এবং প্রচলিত আইনের ধারা উপধারা তুলে ধরেছেন। সেই সাথে আইন সংস্কারেরও  যৌক্তিকতা তুলে ধরেছেন। তবে এই অধ্যায়ে লেখক মুসলিম বিবাহ ও তালাক প্রথা নিয়ে বিশদ আলোচনা করলেও এবিষয়ে অন্যান্য  ধর্মের বিশদ উঠে আসেনি। মুসলিম বিবাহ ও বিচ্ছেদ সম্পর্কে কোরআন হাদিস এবং ইসলাম বিশেজ্ঞদের মতামত তুলে ধরা হয়েছে।
বাউল ভাস্কর্য অপসারণ ধর্মান্ধতার কাছে অসাম্প্রদায়িকতার পরাজয় অধ্যায়ে লেখক ২০০৮ সালের ১৫ অক্বোবর তালেবানি ভাবধারার অনুসারী উগ্রপন্থী ধর্মান্ধ সংগঠন  খতমে নবুওত আন্দোলনের কিছু সংখ্যক কর্মী দেওবন্দি তরিকার অনুসারী ( কওমী মাদ্রসার ছাত্র)  ঢাকায় হযরত শাহজালাল বিমান বন্দরের গোলচত্তরে নির্মিতব্য বাউল ভাস্কর্য ‘খাচার ভিতর অচিন পাখী’  সাধক লালন শাহের ভাস্কর্যটি অপসারনের দাবী তুলে পরবর্তিতে নিজেরাই তা ভেঙ্গে ফেলে।  আর এর মূল হোতা এক উগ্রবাদী মুফতি নূর হোসাইন নূরানি। এর পর বেসামরিক  বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ আর পূননির্মানের উদ্যোগ নেয়নি। এসময় মূর্তি ভাঙ্গার নামে আরেক উগ্রবাদী বর্তমানে প্রয়াত ইসলামী ঐক্যজোটের চেয়ারম্যান মুফতি ফজলুল হক আমিনী ঢাকায় সংবাদ সম্মেলন করে দেশের সব ভাস্কর্য ভাঙ্গার ঘোষনা দেয়। আর এটি ছিল ধর্মকে পূজি করে হাজার বছরের বাঙ্গালী সংস্কৃতিকে ধ্বংশ করার চরম ঔদ্ধত্যপূর্ণ কাজ।  যারা ধর্মকে পূজি করে শিল্প সংস্কৃতিকে ধ্বংশ করতে চায়। এদের বিরুদ্ধে সরকার কি পদক্ষেপ নিয়েছে। এখানেই শেষ নয় এই উগ্রমৌলবাদী গোষ্টী বিভিন্ন নামে দেশে অপতৎপরতা চালাচ্ছে। দেশের বিভিন্ন  স্থানে এরা মুর্তিভাঙ্গা সহ ভিন্ন ধর্মালম্বীদের উপাষনালয়ে হামলা, করছে। এই গোষ্ঠীর কার্যক্রম কি এখনও বন্ধ হয়েছে। না এরা ভিন্ন নামে দেশে আফগান ষ্টাইলের একটি তালেবানী রাষ্ট্র প্রতিষ্টার স্বপ্ন দেখছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ভাস্কর্য রয়েছে যা একটি দেশের সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে ধারন করে। বিশ্বের বহু মুসলিম দেশেও রয়েছে ভাস্কর্য।
বর্তমানে দেশে সাম্প্রদায়িক অপশক্তি আবারও সক্রিয় হওয়ার চেষ্টা করছে। এরা ধর্মের নামে সাধারন মানুষকে শুধু বিভ্রান্তই করছেনা পরোক্ষ ভাবে আমাদের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব এবং শিল্প সংস্কৃতিকে ধ্বংশ করার অপচেষ্ঠায় লিপ্ত রয়েছে। ইদানিং নতুন করে উগ্রবাদীরা সুপ্রিম কোর্টের সামনে স্থাপিত ভাস্কর্যটি অপসারনের জন্যে পায়তারা করছে।  এই ভাষ্কর্যটি হচ্ছে আন্তর্জাতিক ভাবে স্বীকৃত ন্যায় বিচারের প্রতিক লেডি জাস্টিনের ভাস্কর্য। উগ্রবাদীরা এটিকে গ্রীক দেবীর মূর্তি হিসেবে আখ্যা দিয়ে নতুন করে স্বরযন্ত্র শুরু করছে। এই ধর্মান্ধগোষ্টী জানেনা ভাস্কর্য এবং মূর্তির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে মুর্তি নির্মাণ করা হয় প্রার্থনার জন্যে আর ভাস্কর্য হচ্ছে সভ্যতা সংস্কৃতির প্রতিক। এপ্রসঙ্গে সংস্কৃতি মন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর একটি সুন্দর মন্তব্য করেছেন’ তিনি বলেছেন ‘হেফাজতের কথায় মনে হয় বাংলাদেশ ইসলামী প্রজাতন্ত্র।’ আমাদের ভূলে গেলে চলবেনা বাংলাদেশ অসাম্প্রদায়িক দেশ এখানে সকল মত এবং পথের সম অধিকার বিরাজমান যা হাজার হাজার বছর ধরে চলে আসছে।
স্বেচ্ছায় রক্তদান ঃ প্রাসঙ্গিক আলোচনা,  লেখক এই অধ্যয়টি শুরু করেছেন সত্যেন্দ্র নাথ দত্তের একটি কবিতার লাইন দিয়ে
কাল আর ধলো বাহিরে কেবল
ভিতরে সবারই সমান রাঙ্গা।
এই অধ্যায়ে লেখক ১৯০১ সালে অস্ট্রিয়ান নাগরিক কার্ল ল্যান্ডস্টইনার কর্তৃক রক্তের গ্রুপ আবিস্কার করার পর থেকে কিভাবে বিশ্বব্যাপী স্বেচ্চায় রক্তদান শুরু হয় তার বিস্তর আলোচনা, ১৯৫০ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজে প্রথম ব্লাড ব্যাংক প্রতিষ্টা থেকে শুরু করে বাংলাদেশ এর প্রচার সহ  বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন। তার আলোচনায় উঠে এসেছে কারা রক্ত দান করতে পারেন, কোন কোন কারনে রক্তদান থেকে বিরত থাকতে হবে। রক্তদানের সুবিধা অসুবিদার দিক গুলো। সেই সাথে এর ধর্মীয় এবং সামাজিক ব্যাখ্যা। এ প্রসঙ্গে লেখক আধুনিক চিকিৎসা শাস্ত্রের বিভিন্ন খুঁটিনাটি দিক তুলে ধরেছেন।
মরনোত্তর চক্ষুদান বেঁচে থাকুন অন্যের চোখের আলো হয়ে অধ্যায়টি অনুরুপ ভাবে কবি জীবনান্দ দাসের কবিতা দিয়ে শুরু করেছেন
মনে হয় একদিন আকাশের শোক তারা দেখিবনা আর
দেখিবো না হেলেঞ্চার ঝোপ থেকে একঝাড় জোনাকি কখন
নিভে যায় দেখিবো না আর আমি পরিচিত এই বঁাঁশবন
শুকনো বাঁশের পাতা-ছাওয়া মিিট হয়ে যাবে গভীর আাঁদার।
এ অধ্যায়ে লেখক কর্নিয়া কি, চক্ষু দান কি, প্রচলিত আইন চক্ষুদান প্রসঙ্গে ধর্মীয় ব্যাখ্যা অনুমোদন, ইসলামী সংস্থা সমূহের অনুমোদন সহ এর বিভিন্ন দিক তুলে ধরেছেন।  
মরনোত্তর দেহদান এবং অঙ্গ সংযোজন ঃ
মরনোত্তর দেহ দান এবং অঙ্গ সংযোজন এই অধ্যায়টি শুরু করেছেন আলবার্ট আইনষ্টাইনের একটি উদৃতি দিয়ে।  আলবার্ট বলেছেন ‘ মৃত্যুর পর পুরস্কার বা দন্ডপ্রাপ্তির দৃর্ভাবনা করার চেয়ে র্পথিবীতে আমাদের ইহজীবনের উৎসর্গ বিধানই বেশী দরকারী কাজ।’ জীবিতকালে যেমন তেমনি মৃত্যুর পরও মানব কল্যাণে অবদান রাখা যায়। মৃত্যুর পর অসাড় অচল মূল্যবান দেহটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল অথবা রিসার্চ সেন্টারে দান করে। মানুষের ১৪টি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ অন্যে শরীরে প্রতিসন্থাপন করা যায়। এ প্রসঙ্গে লেখক আন্তর্জাতিক আইন,বাংলাদেশের সংযোজিত নতুন আইন, ধর্মীয় বিধান ইত্যাদি বিষয় গুলো পরিস্কার ভাবে তুলে ধরেছেন। কোরআন হাদিসে মরনোত্তর দেহ দান নিষিদ্ধ করা হয়নি। এবিষয়ে সৌদি আরবের জেদ্দায় অনুষ্ঠিত ওআ্ইসির চতুর্থ অধিবেশেনে মরনোত্তর দেহ দান কে অনুমোদন দেয়া হয়। এবং এবিষয়ে উৎসাহিত করতে ওআইসি ভূক্ত দেশ গুলোকে কাজ করতে বলা হয়। এই অধ্যায়টি পাঠ করলে মেডিকেল সাইন্সের অনেক বিষয় সম্পর্কে  অবগত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। বাংলাদেশে সর্ব প্রথম মরনোত্তর দেহ দানের বিষয়টি নজরে আনেন মানিক গঞ্জের বিশ্বরঞ্জন সেন। বাংলাদেশে যারা মরনোত্তর দেহ দান করে মানবতার কল্যাণে বিশেষ অবদান রেখেছেন তাদের একটি চিত্রও ফুটে উঠেছে এই অধ্যায়ে।
সর্বশেষ পাশ্চাত্যের সাহিত্যিকদের আত্মহত্যা দুই শতাব্দির খন্ড চিত্র অধ্যায়ে লেখক প্রাচ্যের চেয়ে কেন প্রাশ্চাত্যের সাহিত্যিকদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশী তা একটি গবেষণার মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। আত্মহত্যার কারণ অনুসন্থান করতে গিয়ে লেখক বহুবিধ কয়েকটি বিষয়কে চিহ্নিত করেছেন। ১৮১১ সালে প্রুসিয়ান (বর্তমান পোলান্ড) নাট্যকার লেখক হাইন রিশ ফন থেকে শুরু কেরে সর্বশেষ ১৯৯৯ সালে ব্রিটিশ নাট্যকার সারা কেইনের আত্মহত্যার চিত্র তুলে ধরেছেন।  
এখন প্রগতিশীল তরুণ এই লেখক সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করে আমার লিখার ইতি টানতে চাই। সামসুল আমিনের সাথে আমার পূর্ব পরিচয় না থাকলেও তার লেখালেখির সাথে আমার পরিচয় ঘটে কয়েক বছর আগে। ২০১৬ সালের অক্টোবর মাসে সিলেটে আমার বন্ধু কয়েস সাহেবের মাধ্যমে তার সাথে পরিচিত হওয়ার সুযোগ হয়। ন¤্র ভদ্র এই তরুন তার বই খানি আমার হতে দিয়ে বলেছিলেন আমি যেন ্একটি সমালোচনা লিখি। তাঁকে কথা দিয়েছিলাম বিলেত ফিরে তার বই সম্পর্কে আলোচনা করব।  শারীরিক অসুস্থতা বিভিন্ন ঝামেলায় যথা সময়ে আমার পক্ষে তা করা সম্ভব হয়নি, এজন্যে আমি ক্ষমাপ্রার্থী।  কে এই সামসুল আলম তার সম্পর্কে সামান্য আলোকপাত করতে চাই। সামসুল আমিনের জন্ম বৃহত্তর সিলেটের সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলার ঐতিহ্যবাহী দাওরাই গ্রামে। পিতার নাম মুক্তার মিয়া, মাতা মিনা বেগম। মুক্তার মিয়া ও মিনা দম্পতির তৃতীয় সন্তান সামসুল আমিন। সিলেট এমসি কলেজ থেকে ¯œাতক পাশ করে সিলেটে একটি বেরকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত। কবিতা দিয়ে তার লেখালেখির জগতে প্রবেশ, সিলেটের স্থানীয় এবং জাতীয় পত্রপত্রিকায় নিয়মিত ফিসার প্রবন্ধ লিখেন। বর্তমানে কর্মের পাশাপাশি সিলেট থেকে প্রকাশিত ইতিহাস ঐতিহ্য সাহিত্য ও সংস্কৃতি বিষয় ম্যাগাজিন পলাশের সম্পাদনার দায়িত্বে রয়েছেন। এই বাইরে তিনি ‘ বিজ্ঞান ও যুক্তিবাদী ক্উান্সিল’, নজরুল একািেডমী, বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি, সিলেট ডায়াবেটিকস সমিতি, সিলেট কেন্দ্রীয় মুসলিম সাহিত্য সংসদ সহ বিভিন্ন সামাজিক সাংস্কৃতিক সংগঠনর সাথে জড়িত।
গ্রন্থ খানির বহুল প্রচার ও প্রসার সেই সাথে লেখকের সুস্বাস্থ্য ও দীর্ঘায়ু কামনা করে শেষ করছি।
লেখক: বিলেতের একজন স্বনামখ্যাত লেখক গবেষক, দৈনিক সুনামগঞ্জের খবর  ও জাতীয় বার্তা সংস্থা এনএনবি‘র লন্ডন প্রতিনিধি