আকবর হোসেন, জামালগঞ্জ
অবশেষে জামালগঞ্জের কালীপুর নেছারিয়া দাখিল মাদ্রাসার জামায়াতী সুপার নূরুল ইসলামকে বহিস্কার করেছেন মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ। মাদ্রাসা সুপার নূরুল ইসলামের অর্থ আত্মসাত ও অনৈতিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছিলেন মাদ্রসার সহকারী শিক্ষক শিক্ষিকা ও পরিচালনা কমিটির সভাপতি। অভিযোগের পর দীর্ঘ দিনের ৩ দফা তদন্ত শেষে গত বৃহস্পতিবার বহিস্কারের সিদ্ধান্ত নেয় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ।
উপজেলা নির্বাহী অফিসারের নিকট লিখিত অভিযোগের পর তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য ইতিমধ্যে ওসি এলএসডিকে দায়িত্ব দেওয়া হলে তদন্তকারী কর্মকর্তা সরেজমিনে গিয়ে অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্ত প্রতিবেদনে মাদ্রাসা সুপারের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের সত্যতা পাওয়া যায়। পরবর্তীতে উপজেলা নির্বাহী অফিসার সাচনা বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রাণতোষ ঘোষ চৌধুরীকে প্রধান করে আরেকটি তদন্ত কমিটি গঠন করে দেন। দীর্ঘ তদন্ত শেষে সাচনা বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রতিবেদনে মাদ্রাসা সুপারের অনিয়ম, অর্থ আত্মসাত ও সহকর্মীদের সাথে অসৌজন্যমূলক আচরণের সত্যতা পেয়ে প্রতিবেদন দাখিল করেন। তদন্ত চলাকালীন সময়ে মাদ্রাসা সুপার সরকারী নিয়ম লঙ্ঘন করে দাখিল পরিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফিস আদায় করলে এলাকার অভিভাবকরা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানান। পরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সিদ্ধান্তে মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সভাপতি জামালগঞ্জ থানায় অতিরিক্ত ফিস আদায়ের জন্য নিয়মিত মামলা রুজু করেন। বর্তমানে জামালগঞ্জ থানায় মামলাটির তদন্ত চলছে। সুপার দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকার পর আদালত থেকে জামিনে এসে বর্তমানে সাধারণ শিক্ষকদেরকে হুমকি দিচ্ছেন। শনিবার সকালে মাদ্রাসা সুপার কয়েকটি মটরসাইকেল নিয়ে রাজনৈতিক দলের ছত্রছায়ায় মাদ্রাসায় প্রবেশ করে সাধারণ শিক্ষকদেরকে হুমকি দেন। এ ঘটনার খবর পেলে লম্বাবাক ও কালীপুরের সাধারণ মানুষ অভিযুক্ত মাদ্রাসা সুপারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করেন। পরে জামালগঞ্জ থানা পুলিশের হস্তক্ষেপে ও আশ্বাসে পরিস্থিতি শান্ত হয়।
উল্লেখ্য মাদ্রাসার সহকারী শিক্ষকরা সুপারের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের প্রতিকার ও ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য লম্বাবাঁক কালীপুর মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতির নিকট লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন সহকারী শিক্ষক জিল্লুর রহমান, আক্তার হোসেন,মোখলেছুর রহমান,নূরুল হক,আব্দুল করিম,ফেরদাউস বেগম। শিক্ষকগণ তাদের লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন, ‘বিধি মোতাবেক উপবৃত্তির টিউশন ফিসের টাকা আমাদের প্রাপ্য। কিন্তু আমরা ২০০৮ ইং সনের ১ম কিস্তি হইতে বর্তমান পর্যন্ত কোন টিউশন ফিসের টাকা পাই নাই। সকল শিক্ষক বার বার বলার পরও আমাদের কথায় কোন কর্নপাতও করে না। শিক্ষকরা আরো জানান, আমরা প্রতিবাদ করলে আমাদেরকে নানান ভাবে হয়রানীর শিকার হতে হয়, এমনকি আমাদের বেতন পর্যন্ত কেটে ফেলে।’ একই ভাবে লম্বাবাঁক-কালীপুর মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি হাজী মোহাম্মদ আলী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার নিকট সুপার নূরুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরেকটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন।
অভিযুক্ত জামায়াত নেতা বহিস্কৃত মাদ্রাসার সুপার নুরুল ইসলামের সাথে কথা বলতে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।
মাদ্রাসার পরিচালনা কমিটির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন,‘মাদ্রাসার শিক্ষকদের অভিযোগের পর প্রথম থেকেই সুপারকে অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাত থেকে ফিরাতে আমি ব্যর্থ হয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে লিখিত জানিয়েছি। পরে প্রাথমিক তদন্তের পরে সাময়িক বরখাস্ত থেকে আবারো সরকারী নিয়ম লঙ্ঘন করে দাখিল পরিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করলে মামলা হয়। সকল প্রতিবেদনের পর বর্তমানে তাকে স্থায়ী ভাবে বহিস্কার করা হয়েছে।
তদন্তকারী কর্মকর্তা ওসি এলএসডি গোলাম আউলিয়া জানান, আমি সরেজমিনে গিয়ে তদন্ত করে প্রতিবেদন দিয়েছিলাম, সুপারের কাজে অসঙ্গতি ও টাকা আত্মসাতের প্রমাণ পাওয়া গেছে।
চূড়ান্ত তদন্তকারী কর্মকর্তা সাচনা বাজার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রাণতোষ ঘোষ চৌধুরী বলেন,‘ আমি তদন্ত কমিটির প্রধান হয়ে সমস্ত স্বাক্ষীর স্বাক্ষ্য নিয়ে সুপারের অনিয়মের বিষয়ে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করেছি।
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা লুৎফুল্লাহিল শাফি বলেন,‘কালীপুর মাদ্রাসা সুপারের অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের একাধিক তদন্ত হয়েছে। সকল তদন্ত কমিটির তদন্তেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা টিটন খীসা বলেন,‘কালীপুর মাদ্রাসা সুপার বহিস্কার হয়েছে। মাদ্রাসায় যাওয়াটা তার বেআইনী। সুপারের কারণে এলাকায় কোন বিশৃংখলা হলে তার উপর দায় বর্তাবে। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।’


