অ্যাড. রতনের স্মৃতি চিরঅম্লান থাকবে

দেবব্রত দাস
নদী-নালা হাওর বেষ্টিত পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে সুনামগঞ্জ শহর দাঁড়িয়ে আছে। পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন স্নেহমায়া মমতা ভরা শান্তি সম্প্রীতির শহরে রতনের বেড়ে উঠা। তার পিতা বিশ্বনাথ রায় কাপড়ের স্বনামধন্য ব্যবসায়ী ছিলেন। রায় পাড়ায় তাদের পৈত্রিক নিবাস। এই বাড়ীতেই স্ত্রী-পুত্র নিয়ে বসবাস। শৈশবে পাঠশালার পাঠ-চুকিয়ে সরকারী জুবিলী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং সুনামগঞ্জ সরকারী কলেজ থেকে বিকম পাশ করার পর তার পিতার ব্যবসা ও বিভিন্ন এজেন্সী ব্যবসায় জড়িত হয়। ব্যবসা বাণিজ্য ভাল না লাগায় আয়কর আইনজীবী পরীক্ষা পাশ করে সুনামগঞ্জ জেলার আয়কর অফিসে আইনজীবী হিসাবে যোগদান। যথেষ্ট সততা ও দক্ষতার সাথে কার্য পরিচালনা করে আসছিল। সেই সুবাদে সুনামগঞ্জ জেলার রাজনীতিবিদ, এমপি, মন্ত্রী, বিশিষ্ট ব্যবসায়ী, পেশাজীবী ও অন্যান্যদের আয়কর নথি পরিচালনা করে আসছিল। পাশাপাশি ধর্মীয় ও সামাজিক কর্মকান্ডে ছিল অত্যন্ত আন্তরিক। অল্প সময়ে সকলের আস্থাভাজন ও প্রিয় মুখ হিসাবে পরিচিতি লাভ করে। আইন পরীক্ষা পাশ করার পর বছর দুয়েক আগে সনদপ্রাপ্ত হয়ে তালিকাভূক্ত আইনজীবী হিসাবে সুনামগঞ্জ জেলা বারে যোগদান করে। আশা করছিলাম তার অকালমৃত্যুতে সুনামগঞ্জ বারে শোকসভা অনুষ্ঠিত হবে। তার স্ত্রী রতœা রায় তালিকাভূক্ত আইনজীবী হিসাবে সুনামগঞ্জ জজ কোর্টে আইন ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। গত ঈদ-উল-ফিতর এর ছুটিতে ভারতের কলকাতায় বেড়াতে গিয়ে হঠাৎ অসুস্থ হলে তার আত্মীয়রা তাকে একটি নার্সিংহোমে ভর্তি করে। অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে স্ত্রী রতœা কালবিলম্ব না করে ক্লাস সিক্স এ পড়–য়া একমাত্র ছেলেকে সাথে নিয়ে সেখানে ছুটে যান। নার্সিংহোমে চিকিৎসাধীন অবস্থায় অল্প কয়দিনেই রতনের মৃত্যু হয়। তার মৃতদেহ সুনামগঞ্জে না এনে তার স্ত্রীর উপস্থিতি ও সম্মতিতে সেখানেই তাকে দাহ করা হয়। তার অকাল মৃত্যুতে সুনামগঞ্জের সকল মহলে শোকের ছায়া নেমে আসে। এই মৃত্যু কেউই মেনে নিতে পারছে না। রতন আমাদের অন্তরে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মত চিরভাস্কর হয়ে থাকবে। তার পেশাগত জীবনের পাশাপাশি বিভিন্ন ধর্মীয় ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানের সাথে শুধু জড়িতই ছিল না। ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অধিকার ও নির্যাতনের প্রতিবাদে রাজপথ কাঁপানো নেতা হিসাবে অনলবর্ষী বক্তা ছিল। ব্যক্তিজীবনে ধর্মের প্রতি শ্রদ্ধাশীল ও নিষ্ঠাবান। জগৎবন্ধু সুন্দর ও মহানামব্রত ব্রহ্মচারীর দীক্ষিত ভক্ত হিসাবে প্রতিবছর সুনামগঞ্জ কেন্দ্রীয় কালিবাড়ীতে জগৎবন্ধু সুন্দরের জন্মতিথি উপলক্ষে অনুষ্ঠানের সর্বাত্মক সহযোগিতা ও বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখত। তার রায় পাড়ায় বাসায় নিজ উদ্যোগে প্রতিবছর হরিনাম সংকীর্ত্তন অনুষ্ঠানের আয়োজন করত। তার মৃত্যুতে রায়পাড়ায় বাসিন্দরা অনুসূচনা করে বলে বৎসরে একবার হলেও হরিনাম শুনে ঘুমাতে যেতাম আর হরিনাম শুনে ঘুম থেকে উঠতাম। সুনামগঞ্জের তারকব্রহ্ম হরিনাম সংকীর্ত্তন উদযাপন পরিষদের সাবেক সাধারণ সম্পাদক ছিল। পরিশেষে পরম স্নেহভাজন এ্যাডভোকেট রতন রায়ের বিদেহী আত্মার শান্তি ও শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা ও মঙ্গল কামনা করছি।
লেখক : সাবেক ব্যাংক কর্মকর্তা