এক বছর ধরে ‘বাংলা কয়লা’ বিক্রি বন্ধ, বিপাকে কয়লা কুড়ানো শ্রমিকরা

সাইদুর রহমান আসাদ
সুনামগঞ্জের বাণিজ্যিক উপজেলা তাহিরপুরের সীমান্তে কয়লা কুড়িয়ে সংসারের হাল ধরেছে বহু নিম্নআয়ের মানুষ। পাশ^বর্তী দেশ ভারত থেকে পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ভেসে আসা কয়লা কুড়িয়ে বহুদিন ধরেই পরিবার পরিজন নিয়ে জীবন- জীবিকার লড়াই করছেন তারা। বর্তমানে এসব কয়লা বিক্রি বন্ধ থাকায় হুমকিতে সীমান্তের হাজারও মানুষ। ছোট ব্যবসায়ীরাও এই কয়লা কিনে লোকসানের মুখে। অনেক ব্যবসায়ী দিনমজুরের কাজ করে সংসারের হাল ধরেছেন।
গেল এক বছর প্রশাসনের বাধার মুখে বন্ধ রয়েছে এই কয়লা বিক্রি। এতে বিপাকে পড়েছেন এসব মানুষ।
মেঘালয় থেকে নেমে আসা নদী ও ছড়া থেকে কুড়িয়ে আনা কয়লাকে স্থানীয় ভাষায় বলে ‘বাংলা কয়লা।’ ভারত থেকে আমদানি করা কয়লা ও পাহাড়ি ঢলের সঙ্গে ভেসে আসা কয়লার মাঝে রয়েছে কিছু পার্থক্য। আমদানি করা কয়লা ছোট ও হাতে কালো দাগ পড়ে। অপর দিকে ছড়া বা নদী থেকে কুড়ানো কয়লা যেমন বড় বড় দানা হয় তেমনি হাতে কালো দাগ পড়ে না।
এক বছর আগে ছড়া ও নদী থেকে কুড়িয়ে আনা কয়লা বাড়িতে পড়ে আছে অনেকের। এই বাংলা কয়লা বিক্রি করতে না পেরে পরিবার পরিজন নিয়ে খেয়ে না খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে কুড়ানোর কাজে থাকা হাজারও শ্রমিক। বাংলা কয়লার ছোট ব্যবসায়ীরাও পড়েছেন লোকসানে। অনেক ব্যবসায়ী পেশা বদল করে দিনমজুরের কাজ করছেন।
চারাগাঁওয়ের বাসিন্দা ষাটোর্ধ্ব আছিয়া বেগম বললেন, আমরা গবীর মানুষ। স্বামী নেই। ছড়া থেকে অল্প অল্প ভাসমান কয়লা কুড়িয়ে বিক্রি করে সংসার চালাই। গত ১ বছর ধরে বিক্রি করতে পারছি না। বাড়ির উঠানে পড়ে আছে। এখন খেয়ে না খেয়ে দিন যাচ্ছে।
একই গ্রামের বাসিন্দা মরিয়ম বেগম বললেন, বর্ষায় বৃষ্টিতে ভিজে স্বামী ও সন্তানদের নিয়ে কয়লা কুড়িয়েছি। এক সিজনের কয়লা আরেক সিজন হয়ে গেছে বিক্রি করতে পারছি না। বাচ্চা নিয়ে উপোস, এখন ঋণ করে পরিবার চলছে।
বর্ষায় তাহিরপুরে সীমান্ত নদী যাদুকাটা, চানপুর ছড়া, বড়ছড়া, লাকমাছড়া, কলাগাঁও ছড়াসহ ভারত থেকে নেমে আসা প্রতিটি নদীতে গিয়ে কয়লা কুড়ানোর দৃশ্য চোখে পড়বে। প্রতিটি ছড়া ও সীমান্ত নদীতে হাজারও নারী, পুরুষ, শিশু দলবেধে কয়লা কুড়াচ্ছেন। এই কয়লা কুড়িয়ে প্রায় ৩০ বছর যাবৎ এলাকার নিম্নআয়ের মানুষের বড় একটা অংশের জীবন জীবিকা চলছে।
ছোট ব্যবসায়ী মো. মোশাররফ হোসেন বলেন, আমার ২টি গরু বিক্রি করে কিছু কয়লা কিনেছিলাম। কেনা কয়লাগুলো বিক্রি করতে পারছি না। আমার সন্তান কেজি স্কুলে পড়ে। সেখানে প্রায় আট হাজার টাকা বকেয়া হয়েছে। প্রায় আড়াই লক্ষ টাকার কয়লা না বিক্রি করতে পেরে এখন ডিপুতে দিনপ্রতি তিনশ’ টাকা মজুরিতে হাজিরা দিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন বলে জানিয়েছেন তিনি।
ছোট ব্যবসায়ী মো. মারফত আলী বললেন, মেঘালয়ে বৃষ্টি হলে ভেসে কিছু কয়লা আসে। সেগুলো প্রায় ত্রিশ বছর ধরে হাজারও শ্রমিক জালি (জাল) দিয়ে ছড়া থেকে কুড়িয়ে সংসার চালিয়েছে। অনেক কষ্ট করে সারাদিনে এক থেকে দেড় বস্তা কয়লা কুড়াতে পারে তারা। তাদের থেকে প্রতি বস্তা দেড়শ’ থেকে দুইশ’ টাকা দরে কিনি আমরা। গত এক বছর ধরে এই কয়লা কিনে আমরা আটকে গেছি। বিক্রি করতে পারছি না।
এদিকে শনিবার বাগলি বাংলা কয়লা স্তূপ পরিদর্শন করেছেন তাহিরপুর উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. আলাউদ্দিন। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে কুড়ানো কয়লার শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলেন।
এসময় তিনি বলেন, বাগলিতে বাড়ির উঠানে বাংলা কয়লার নামে চোরাই কয়ল রাখা হয়েছো কিনা এগুলো যাচাই করেছি, এখানে এসে দেখলাম এগুলো বাংলা কয়লা। নদী, ছড়া থেকে ঠেলা জাল দিয়ে তুলা হয়েছে। যদিও এগুলোর কোনো অনুমতি নেই সেজন্য জরিমানা করা যায়। প্রশাসনের পক্ষ থেকে এগুলোকে জরিমানা করার বিপক্ষে। কারণ খুবই নি¤œআয়ের মানুষ এগুলো তুলে পরিবার চালায়। যেহেতু তুলে ফেলেছে সেজন্য এগুলো সরানো জরুরি। তাই আমাদের নির্দেশনা হলো এই বাংলা কয়লাগুলো খুব দ্রুত অপসারণ করার।
সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবি’র অধিনায়ক লে. কর্ণেল মো. মাহবুবুর রহমান বললেন, আমার জানা মতে কয়লা উত্তোলনের কোনো অনুমোদন নেই। ভারত থেকে যে কয়লা আমদানী হয় তার অনুমোদন রয়েছে। আর ছড়া ও নদী থেকে কয়লা তুলার কোনো অনুমোদন আছে বলে আমার জানা নেই। আর যদি দিতে হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট দপ্তরের মতামত নিয়ে অনুমোদন প্রয়োজন। আমি চাইলেই কাউকে কয়লা তুলার অনুমতি বা নিষেধ দিতে পারি না।
জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর হোসেন বললেন, তাহিরপুরের নি¤œআয়ের মানুষ, শ্রমিক কয়লা কুড়িয়ে পাঁচশ’ থেকে ছয়শ’ টাকা আয় করে, আমাদের অংশে ভাসমান কয়লা তুলা বন্ধ নেই। কিন্তু মাটি খুঁড়ে কয়লা উত্তোলন করা বা নদীর তলদেশ খনন করে কয়লা উত্তোলন করা বন্ধ রয়েছে। তবে অনেক শ্রমিক কয়লা উত্তোলন করতে করতে সীমান্ত অতিক্রম করে। সেক্ষেত্রে বিজিবি বাধা দেয়।