কৃষিমন্ত্রী ও পানিসম্পদমন্ত্রী দুর্যোগকবলিত হাওরে আসুন

হাওর ডুবে বোরো ফসল হানি অব্যাহত আছে। রবিবার সকাল থেকে বৃষ্টি না হওয়ায় মানুষের মনে যে আশার সঞ্চার হয়েছিলো সেটুকু উবে গেছে নতুন করে বিভিন্ন হাওরের বাঁধ ভেঙে পানি ঢুকার খবর পেয়ে। ইতোমধ্যে জেলার সবচাইতে বড় শস্যভা-ার নামে খ্যাত দেখার হাওরে রবিবার থেকে পানি ঢুকা শুরু করেছে। রক্তি নদীর পানি ঢুকছে বিশ্বম্ভরপুরের খরচার হাওরে। এরকম অবস্থা জেলাজুড়ে। কৃষকদের বিলাপে আকাশ ভারী হচ্ছে। শহরের মানুষ কৃষিনির্ভর পরিবারের এই আহাজারি বুঝবেন না। সর্বস্ব হারিয়ে ফেললে মানুষ যেমন চোখে অন্ধকার দেখেন জেলার কৃষকদের হয়েছে সেই অবস্থা। এদিকে বিভিন্ন জায়গায় অসহায় কৃষকরা নিজেরা চেষ্টা চালিয়ে বাঁধ রক্ষায় বিফল হচ্ছেন। গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে সংগ্রামী কৃষকদের বাঁধ রক্ষার এমন প্রয়াসের ছবি ছাপা হয়েছে। ছবির এই চিত্র এখন হাওরের সর্বত্র। তাহিরপুরে দোকানপাট বন্ধ রেখে লোকজন শনির হাওরের বাঁধ রক্ষার  কাজে নিয়োজিত রয়েছেন। হাওরে প্রকৃতির বিরুদ্ধে কৃষককূলের এই লড়াইয়ে দায়িত্বশীলদের নিকট থেকে প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পাওয়ারও অভিযোগ উঠেছে।
একের পর এক হাওর ডুবির ঘটনা ঘটার পাশাপাশি আরেকটি হাস্যকর প্রবণতা দেখা যাচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। বিভিন্ন পর্যায়ের নেতারা ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে জনগণকে সহনাভূতি জানাচ্ছেন। তাদের এই জনদরদী কর্মকা-ের ছবি ও সংবাদ গণমাধ্যমে পাঠাচ্ছেন, অনেকে ফেসবুকে ছবিসমেত আপলোড করছেন। এইসব ব্যক্তির দুর্যোগকবলিত হাওর পরিদর্শনের ছবি সর্বহারা কৃষক সমাজের জন্য পরিহাস বৈ আর কিছু নয়। কারণ বাঁধ ভাঙার মতো বাস্তবতা হাওরগুলোতে বিরাজমান থাকা সত্বেও তারা কখনও এর বিরুদ্ধে সোচ্চার হননি। বাঁধের সীমাহীন দুর্নীতি রোধে এই ক্ষমতাধর সামাজিক-রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের ভূমিকা ছিলো শূন্যের কোঠায়।  বাঁধের কাজে অনিয়ম-দুর্নীতির উল্লেখ করে পত্র-পত্রিকাগুলো যখন খবর ছেপে চলেছিলো তখন অধিকাংশ ক্ষেত্রে কেউ এই অনিয়ম দুর্নীতি রোধে এগিয়ে আসেন নি।  তাই ফসলহারা কৃষকরা এই প্রচারসর্বস্ব দরদী ব্যক্তিদের হাস্যকর কর্মকা-ে বিরক্ত ও ক্ষুব্ধ হচ্ছেন।   
এখন সবচাইতে জরুরি কাজ হচ্ছে ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণ, ক্ষতির পরিমাণ যতটুকু সম্ভব এড়ানো ও পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা। গতবার আমরা হতাশাজনকভাবে লক্ষ্য করেছি বিপুল পরিমাণ বোরো ফসল হানি ঘটলেও কৃষি সম্প্রসারণ বিভাগ ক্ষয়-ক্ষতির পরিমাণ এমন পরিমাণে দেখিয়েছেন যা প্রতি মৌসুমে এমনিতেই হয়ে থাকে। জেলাবাসী কৃষি সম্প্রসারণের এমন পরিসংখ্যানকে প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। এর ফল হয়েছিলো ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকরা কোন ধরনের পুনর্বাসন সহযোগিতা পান নি। ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণের ক্ষেত্রে এবারও যদি একই ধরনের চর্চা অব্যাহত থাকে তাহলে সর্বস্ব হারানো কৃষি পরিবারের অন্তরের আগুন দ্বিগুন হবে। ক্ষয়-ক্ষতি নিরূপণ ও ক্ষতিগ্রস্ত কৃষি পরিবারের যথার্থ তালিকা প্রণয়নের পর পুনর্বাসনের প্রশ্নটি সামনে আসবে। আর যেসব ব্যক্তির সীমাহীন লোভের পকেটে ঢুকেছে বাঁধ নির্মাণের ৫৯ কোটি টাকা তাদের বিচারের মুখোমুখি দাঁড় করাতে হবে।
জেলার জীবন ও জীবিকার সবচাইতে বড় বিপর্যয়ের এই সময়ে পানিসম্পদমন্ত্রী বা কৃষিমন্ত্রীর হাওর এলাকা পরিদর্শনে না আসা আরেক দুঃখজনক বিষয়। জেলার দায়িত্বশীলরা সম্ভবত ক্ষয়-ক্ষতির ভয়াবহতা তাঁদেরকে সঠিকভাবে জানান নি। আমরা নিজেদের সীমিত শক্তি দিয়ে দেশের পানিসম্পদমন্ত্রী ও কৃষিমন্ত্রীকে বিনয়ের সাথে হাওরবাসীর দুর্ভোগ-যন্ত্রণা নিজের চোখে এসে দেখে যাওয়ার অনুরোধ জানাই। কতটুকু ক্ষতি হলে সরকারি হিসাবের খাতায় নাম উঠে সেটিও বলে যান আপনারা। এই অঞ্চলের কৃষকরা সামনের বছর কীভাবে বাঁচবেন সে বিষয়ে আশ্বাস দিয়ে যান আপনারা। কারণ এই ভাগ্যবিড়ম্বিত মানুষগুলো বাংলাদেশেরই।