ইকবাল কাগজী
পূর্ব প্রকাশের পর
দুই ॥ এই রক্তবীজের বিনাশ চাই
চূড়ান্ত বিবেচনায় প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত মানুষ সামাজিক সম্পর্কের নির্ভরতাসঞ্জাত ব্যক্তিত্বের অধিকারী জৈবিক মূর্ততাÑ অর্থাৎ ব্যক্তিত্ব। ব্যক্তিত্ব আসমান থেকে পড়ে না, সমাজের মাটিতেই কিংবা সমাজে বিদ্যমান উৎপাদনসম্পর্কের পরিসরেই তার অঙ্কুরোদ্গম ঘটে। অর্থাৎ ব্যক্তিত্ব মানুষের চারিত্র্যলক্ষণ রূপে বিকশিত ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিকতা থেকে অনিবার্যভাবে জাত। এই ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিকতা যে-কোনও মানুষ কিংবা যে-কোনও ব্যক্তি-বিশেষকে ‘সামাজিক সম্পর্ক ও ক্রিয়াকলাপের কর্তা’য় (গ. কিরিলেঙ্কো, ল. করশোনোভা ॥ ব্যক্তিত্ব কী, অনুবাদ : সুবীর মজুমদার, প্রগতি প্রকাশন মস্কো : ১৯৮৯, পৃষ্ঠা : ২৯২) পর্যবসিত করে প্রকারান্তরে ‘সমাজের সদস্য রূপে উত্থাপন করে’ (গ. কিরিলেঙ্কো …, প্রাগুক্ত)। মানুষের ব্যক্তিত্ব কী, তার উন্মেষের ইতিবৃত্ত মেলে কার্ল মার্কসের ঐতিহাসিক ভাষ্যে। তিনি বলেছেন, ‘বৈষয়িক জীবনের উৎপাদন-পদ্ধতিই সাধারণভাবে মানুষের সামাজিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক জীবন প্রক্রিয়াকে নির্ধারণ করে। মানুষের সত্তা তার চেতনা দ্বারা নির্ধারিত নয়, বরং ঠিক বিপরীতভাবে, মানুষের সামাজিক সত্তাই নির্ধারিত করে চেতনাকে।’ (কার্ল মার্কস, ‘অর্থশাস্ত্রের সমালোচনা প্রসঙ্গে’ গ্রন্থের ভূমিকা, কার্ল মার্কস ফ্রেডারিক এঙ্গেলস রচনা-সংকলন : প্রথম খণ্ড দ্বিতীয় অংশ, প্রগতি প্রকাশন মস্কো, প্রকাশ কাল : ১৯৭১, পৃষ্ঠা : ২৫)। এই কারণে প্রতিষ্ঠিত এই সমাজসংস্থিতিটা সকল সমাজসদস্যের জন্যে এমন একটি জীবনকাঠামো (মূলত উৎপাদন পদ্ধতি কিংবা আর্থসামাজিক পরিবেশ) প্রস্তুত করে রেখেছে যে, সে-মূর্তনির্দিষ্ট কাঠামোর ভেতরে একাধারে ঐতিহাসিক ও মানবিক সত্তাসম্পন্ন কোনও মানুষ ভালো ও সুস্থ থাকতে পারে কিংবা পারে না, প্রকারান্তরে সুখী কিংবা অসুখী হয়ে উঠে। কিন্তু প্রকৃতপ্রস্তাবে দুর্বৃত্ত কতিপয় সমাজনিয়ন্ত্রক সিংহসনে আসীন হয়ে সমাজের সংখ্যাগরিষ্টের ভালো থাকাকে ভালো না থাকায় প্রতিনিয়ত পর্যবসিত করছে। তাদের দুরভিসন্ধিসঞ্জাত এই কাঠামোটাকে বিশেষ বিবেচনায় অনেকেই কাঠামোগত সন্ত্রাসের উৎস বলে অভিহিত করেছেন, যে-কাঠামোগত সন্ত্রাস বর্তমানে সমাজব্যবস্থার নিয়ন্ত্রকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। এমতাবস্থায় প্রকৃতপ্রস্তাবে যেখানে শান্তি নেই, সেখানে সেহেতু সুখও নেই। সুতরাং এখানে উদ্ভূত উৎপাদনসম্পর্ক নির্ভর সামাজিক পরিবেশের বিস্তৃত পাটাতনে যাপিত জীবনে মানুষের সর্বাঙ্গীন ও সুষম বিকাশ প্রায় অসম্ভব এবং মানুষ স্বাভাবিকভাবেই তার শারীরিক উৎকর্ষ, চিৎপ্রকর্ষতা ও নৈতিক শুদ্ধতা অর্জনে ব্যর্থ। অতিশয় পরিতাপের বিষয় যে, আমাদের সমাজ এইরূপ একটি ব্যর্থ সমাজ। এই ব্যর্থতা সমাজের একক ব্যক্তি মানুষের শান্তি ও সুখ সৃষ্টির অন্তরায়। এখানে উদ্বৃত্তমূল্যশোষক লক্ষকোটি টাকার মালিক মুদ্রাস্ফীতির কল্যাণে যখন তার অধীনস্থ শ্রমিকের খাদ্যনিরাপত্তা বিঘ্নিত হয় তখনও সে-শ্রমিকের মজুরি বাড়াতে চরিত্রগতভাবেই কোনও ইচ্ছা পোষণ করেন না, বরং বিপরীতে তাঁর অধীনস্থ এই শ্রমিকের শ্রমশক্তি শোষণের আর্থনীতিক কার্মকাণ্ডের সার্থকতা- যাকে বলা হয়েছে উদ্বৃত্তমূল্য শোষণ অর্থাৎ চুরি- তাঁর যাবতীয় জাগতিক সুখৌশ্বর্যের উৎস হয়ে উঠে এবং তজ্জন্য শেষ পর্যন্ত মানবতাবিরোধী আত্মসাৎই পুঁজিপতির জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এবং এই করতে গিয়ে এই পুঁজিপতি প্রকারান্তরে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে সমগ্র প্রজাতিসত্তা থেকে। শ্রমিকের মজুরি না বাড়ানোর কার্যক্রমটাও এই আত্মসাতের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং মদ্রাস্ফীতির সাপেক্ষে যা আসলে শ্রমিকের মজুরি কমানোরই নামান্তর। কেন না শ্রমিক এখন আর তার জীবন ধারণের প্রয়োজনীয় নির্দিষ্ট পণ্য পূর্বেকার দামে কিনতে পারবে না, বরং নতুন করে বর্ধিত আকারে নির্ধারিত বাজার দরে কম পরিমাণে কিনতে বাধ্য হবে। এবংবিধ সমাজনিয়ন্ত্রক চোর যখন মুদ্রাস্ফীতির পরিসরে শ্রমিকের মজুরি বাড়ায় না, বাজার থেকে বেশি দামে শ্রমিককে পণ্য ক্রয় করতে বাধ্য করে, তখন সমগ্র সমাজপরিসটিই দূষিত হয়ে উঠে। এইরূপ দূষণ সমাজ পরিসরে নিরন্তর ঘটে চলেছে, রন্ধ্রে রন্ধ্রে তার বিস্তার এবং প্রতিরোধের বিপরীতে রক্ষণশীল প্রতিক্রিয়াশীলতার সন্ত্রাসী ছোবল তো পড়ছেই যত্রতত্র। একটির পর একটি দূষণের শিকার হতে হতে সমগ্র সমাজটা প্রকৃতপ্রস্তাবে প্রতারণা ও মিথ্যাচারের, তঞ্চকতা ও তস্করতার, খুন ও ধর্ষণের মৃগয়াক্ষেত্রে পর্যবসিত হয়। আর এইভাবে কেবল আত্মসাৎ হয়ে উঠে সমগ্র সমাজের চলিতকর্মের সারাৎসার এবং চরিতার্থতার পরিণতিতে যাবতীয় স্থাবর অস্থাবর সম্পদের দখলচ্যুতির মুক্তাঞ্চলে পরিণত হয় সমাজ। এবংবিধ সমাজে কোনও শান্তি সুখের আশা তো আকাশকুসুমে পর্যবসিত হতেই পারে। তাতে অবাক হওয়ার মতো কীছু নেই, বরং নিঃসন্দেহ হওয়াই উত্তম। এই বিষয়টি যাঁরা বুঝেন না অথচ নিজেকে বিশ্বপ্রেমিক, মানবতাবাদী, গণতন্ত্রী, বিবেকবান, ন্যায়তার পূজারী, সত্যবাদী, সৎ, অসাম্প্রদায়িক, মুক্তচিন্তক বলে ভাবেন ও প্রচার করতে কসুর করেন না, তাঁরা অবশ্য অবশ্যই জগৎশ্রেষ্ঠ ভণ্ড, মানবপ্রজাতির বিভীষণ। তাঁরা প্রকারান্তরে উদ্বৃত্তমূল্য শোষকতন্ত্রের সেবাদাসত্বে নিজেদের জীবন উৎসর্গ করে তার (পুঁজিপতির) পা চাটার দলে নিজেদেরকে ভুক্তিভুক্ত করেছেন। ইতোমধ্যে প্রত্যক্ষ করা গেছে, এখানে এই বাংলাদেশে উন্নয়ন হয় কিন্তু উন্নয়নের অভ্যন্তরে ধনবৈষম্যের কিংবা সম্পদবৈষম্যের রক্তবীজ উপ্ত থেকে যায়। সংবিধানে সমাজতন্ত্র লিখে রেখে রাজনীতি যখন তার বিপরীত দিকে অসমাজতন্ত্র কায়েমের পথে বিচরণ করে, তখন এই বিভীষণরা গা করেন না, বরং প্রাতিস্বিক মনস্কামনা চরিতার্থতার মিছিলে শরিক হয়ে আত্মসাতের মহাযজ্ঞে নিরত হন নির্দ্বিধায় ও নিশ্চিন্তে। এইভাবে সম্পদবৈষম্য বৃদ্ধির বৈষয়িকতায় নাক ডুবিয়ে রাখার চেয়ে আত্মপ্রতারণা আর কী হতে পারে। ব্যক্তির শান্তি ও সুখ নিশ্চিত করতে এই রক্তবীজের বিনাশ অর্থাৎ উদ্বৃত্তমূল্য শোষক ও তার বিশ্বস্ত দালালগোষ্ঠীর বিনাশ চাই।
চলবে
- জালিয়াতের বিরুদ্ধে মামলা এই দৃষ্টান্ত সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে
- প্রতিপক্ষকে ফাঁসাতে গিয়ে ফেঁসে গেলেন নিজেই


