ইশতিয়াক রূপু।
নিউইয়র্কে গভীর রাত। অনেক চেষ্টা করে চোখের দুটো পাতা এক করতে পারছি না। বার বার মনে ফিরে আসছে আশি দশকের শুরুর দিনগুলির নানা স্মৃতি। বয়সে প্রায় ৭ বছরের বড় তবে কখনো তা মনে হয়নি। ৮৪ সালের প্রথম দিকে সুনাম পত্রিকা প্রকাশের সময় আমার একটি প্রস্তাব ছিলো। যা পরে কার্যকরী হয়নি। কেনো হয়নি তা কখনো বলেন নি। পরে যোগ দিলাম বড়দের দশ রকমের আড্ডায়। আমি জাহানুর বাদে বাদ বাকি সবাই আমাদের সিনিয়র। খসরু ভাইর রসবোধ ছিলো অসামান্য। ফেলে আসা দিন কালের কত গল্প বলতেন। জুবিলীর গল্প, কলেজের গল্প, নাটকের গল্প, শহর রাজনীতি নিয়ে অনেক হাসির গল্প। কারো বদনাম বা ক্ষতি হউক তা কোনদিন চাইতেন না। কফিলদের বাসার সামনে ব্যাডমিন্টনের আসরে যোগ দিতেন, নিজে আনন্দ করতে সবাইকে আনন্দ দিতে। আর্থিক গুবলেটে পড়ে দেশে ছাড়লাম ৯৪ সনে। যেখানে বসতেন আমার জন্য আফসোস করতেন। বলতেন লোকজন তাঁর সরলতার সুযোগ নিলো। জোর দিয়ে বলতেন, তোমরা সবাই দেখো একদিন সব ঝঞ্জাট ছুড়ে ফেলে ফিরে আসবে তার প্রিয় শহরে। আমি খসরু ভাইর আশার সম্মান রেখেছি। ফিরে এসেছি সবার দেনা শোধ করে সাত বছর প্রবাস বাস করে। একুশ শতাব্দীর আধুনিক রাজনীতি অনেক ঝাপসা আজকাল। অনেকে এখন চেনা যায় না। সুদে খাটানো টাকা উদ্ধারের কন্ট্রাক্ট নিয়ে যারা দলবল নিয়ে শহরের সড়ক দাপিয়েছেন তারা আজ জনগণের সেবক। আমাকে নিয়ে ইকবাল ভাইয়ের (আলীমাবাগ) কতই না উৎকন্ঠা। চুপি চুপি নিয়ে গেলেন মোসাদ্দেক ভাইর বাসায়। খানিক পর চাঁদর মুড়ি দিয়ে খসরু ভাই উপস্থিত। সঙ্গে জাহানুর ও সালেহ ভাই। সালেহ ভাইর হুংকার ‘কুলির ফোয়ারে জবো খরিলিমু’। এর নামই ভালবাসা আর অকৃত্রিম স্নেহ। আড্ডার স্থান ছিলো ছড়ানো পুরো শহর জুড়ে।
উকিল পাড়ার নদীর পাড়ে মোসাদ্দেক ভাইদের রাইস মিলে নানা কিসিমের আড্ডা। মল্লিকপুর থেকে আসতেন এক পরহেজগার শিল্পপতি ও অন্যজন খসরু ভাইদের বন্ধু আমাদের সিনিয়র। আড্ডায় যোগ দিতে তাড়াহুড়া করে আসতেন অর্ধের নামাজ আদায় করে। শুরুর দিকে সবাই নানা কারণে উত্তেজিত থাকতেন। খসরু ভাই দুজনকে বাকি নামাজ আদায় করতে স্মরণ করিয়ে দিতেন। কেউ শুরুতে আদায় করতো কাজা নামাজ, কেউ আবার আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে। সে গল্প গুলো মজা করে বলতেন খসরু ভাই। নতুন পাড়ার এক বাসায় দুপুরের খাবারে দেয়া হতে গরম গরম আটার তৈরী চাপাতি ও চুল চিকন আলু ভাজি। খসরু ভাই ভীষন পছন্দের ছিলো চিকন করে কাটা আলু ভাজি। বেশি করে বানাতে তাগিদ দিতেন। রোকেসদের বাসার দোতালায় ছুটির দিনের আড্ডায় ঘরে তৈরী সিঙ্গাড়ার সুনাম করেছেন এ কয়দিন পূর্বে। যে বার দেশে গেলাম তখন। কত গল্প বলবো। আব্বার কথা বলতেন। তিনি নাকি জুম্মার নামাজ শেষে পরিচিত যাদের চোখে পড়তো সবাইকে বাসায় এনে দুপুরে আপ্যায়িত করতেন। খসরু ভাই বলে দিলেন আব্বার নিজ কপি করা পুরো কোরান শরীফ পাবলিক লাইব্রেরীতে দেওয়ার জন্য। আমি তাই করেছি। আব্বা যে ভাতা পেতেন তার আংশিক পরিমান দিয়ে গৌরবের মুক্তিযুদ্ধ ট্রাস্টে শরীক হতে বললেন। আমরা তাই করেছি। গেলোবার পাবলিক লাইব্রেরির অফিস কক্ষে বসে সালেহ বাবলু সহ আরো কারো সঙ্গে গল্প করছি। হঠাৎ সালেহীন এসে বলছে, ভাই খসরু মামা উপরে আসতে বলেছেন। তার সঙ্গেই গেলাম ২য় তলায় সম্মেলন কক্ষে। সভা চলছে। হাওর বাঁচাও আন্দোলন কমিটির। জানতে চাইলাম খসরু ভাই আমি কেনো? বললেন তুমি তো আসল হাওরের পাড়ের লোক। তুমি নিউইয়র্ক গিয়ে লিখবে আমাদের ভাটির কৃষকদের এই দুঃখের কথা কষ্টের কথা। সুনামগঞ্জ যাওয়া মাত্র খবর পেয়ে যেতেন। মুসলিম হোস্টেলের মসজিদে ফজরের আজানের কতক্ষণ পর ফোন আসতো চলে আসো কলেজে। তোমার জন্য সোনালী সকালের সকল সদস্য ও সভাপতি অরুন বাবু অপেক্ষায়। ভোরের আলো ধীরে ধীরে ফুটছে তারই সঙ্গে আমি ও ছুটছি কলেজ পানে। যাওয়া মাত্র আমাকে ফুল দিয়ে বরণ করতে সভাপতি ও সদস্যরা। সব সদস্যরা কিছু না কিছু বলতেন। তারপর আবার হাঁটা শুরু। আমি উপস্থিত হলেই বিশেষ ঘোষণা আসতো। যা আমি দেশে আসবো জেনে স্থগিত ছিলো কিছু দিন। কমপক্ষে ত্রিশ বছরের সম্পর্ক কত গল্প আর আড্ডার স্মৃতি আছে খসরু ভাইকে নিয়ে। শহর কে নিয়ে ফেইসবুকে আমার লেখা খুবই পছন্দ করতেন। প্রতিবার তাগিদ দিতেন সব একখানে করে বই বের করতে। নিউইয়র্কে ভোরের আলো ধীরে ধীরে ফুটে উঠছে। দেশে এখন দিনের শেষে বিকাল। সেই পড়ন্ত বিকালে শহরের সবাই আপনার সাথী হয়েছেন আপনারই পড়ন্ত সময়ে। আর খানিক পর আপনাকে একা রেখে সবাই ফিরবেন নিজ গৃহে। শুধু ফেরা হবে না আপনার চেনা পথ ধরে ষোলঘর চৌরাস্তা ধরে পশ্চিম মুখো নদীর পাড়ের রাস্তা ধরে। দু’পাশে ডালা ভর্তি বসা মাছের মালিক বলবে না। উকিল সাব তাজা মাছ নেওকা! সুরমার নদীর মাছ, ঝাওয়া বিলের মাছ। আমি হয়তো দেশে যাবো ভোরের আজান হবে শুধু তারপর কি আমার টেলিফোন বেজে উঠবে কেউ কি বলবে! রূপু আইছো?
চলে আসো কলেজ মাঠে। আমরা সবাই তোমার অপেক্ষায়। তাই তো কথা ছিলো খসরু ভাই আমি দেশে আসবো আর আপনি অপেক্ষায় থাকবেন সোনালী সকালের সবাই কে নিয়ে। অরুন বাবু, জামাই বাবু, সতু দা, চাষী ভাই, ফুটবলার মতিন, উকিল বাবু স্বপন দা (ছোট) সহ আরো অনেক নাম না জানা প্রিয়জন।


