জাতীয় বাজেট ২০২৩-২০২৪ কর ফাঁকি রোধ ও ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা জরুরি

২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটে সর্বজনীন পেনশন স্কিম প্রবর্তনের বিষয়টি একটি ভালো পদক্ষেপ। পাশাপাশি রির্টান জমা দানে বাধ্য ব্যক্তিদের ন্যূনতম করযোগ্য আয় না থাকলেও দুই হাজার টাকা আয়কর পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রাখার প্রস্তাবটি একেবারেই বেমানান ঠেকেছে। বলা হয়, বাংলাদেশে যারা বিভিন্নভাবে বড় অংকের আয় রোজগার করেন তারা সঠিকভাবে আয়কর পরিশোধ করেন না। কর ফাঁকির ব্যাপক প্রবণতা রয়েছে আমাদের দেশে। করফাঁকি রোধ করার পরিবর্তে কেন নিরীহ সাধারণ মানুষ যারা টেনেটুনে বছরে তিন লাখ টাকা রোজগার করতে পারেন না তাদের উপর বাধ্যতামূলক করারোপ? এটিকে শক্তের তোষণ ও দুর্বলের পীড়ন হিসাবে আখ্যায়িত করা যেতে পারে। আমাদের পুরো সমাজ ব্যবস্থাটাই এখন শক্তিশালী, ক্ষমতাশালী ও প্রভাবশালীদের নিয়ন্ত্রণে চলে গেছে। তারা যেন সব আইন কানুনের উর্দ্ধে। তাদের আয় থেকে বছরে সরকারি রাজস্ব খাতে ১০ কোটি টাকা কর দেয়ার অবস্থা থাকলেও দশ লাখ টাকা দিয়েই তারা দায়মুক্ত হয়ে যেতে পারেন। আইনের হাত তাদের গলায় ফাঁস হয়ে আটকাতে পারে না। আইনের ফাঁস যত সব দুর্বলের জন্য। কেবল জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ হয়েছে। চূড়ান্ত অনুমোদনের পর হয়তো এই জায়গায় স্বস্তিদায়ক সংশোধনের খবর মিলবে, আপাত শান্তি পাওয়ার উপায় এই। আমরা যখন ক্রমশ মধ্য আয়ের দেশে পরিণত হওয়ার দিকে এগোচ্ছি তখন অবশ্যই আমাদের রাষ্ট্র কাঠামোকে কল্যাণমূলক স্তরে নিয়ে যেতে হবে। একইসাথে অভ্যন্তরীণ প্রত্যক্ষ কর আদায়কে সন্তোষজনক পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে। মূলত উন্নত দেশের যে রকম আদর্শ ও স্বচ্ছ কর কাঠামো থাকে আমাদেরও সেরকম ব্যবস্থাপনা তৈরির দিকে যেতে হবে। উন্নত হওয়ার এই জ্বালা যে, নিজে আয় করে তবে ব্যয় করতে হবে। কেউ কিছু দিবে না।
কল্যাণ রাষ্ট্রের যে ধারণা আমরা পাই সেখানে নাগরিকদের যেমন রাষ্ট্রের প্রতি কর্তব্যবোধের জায়গা প্রবল থাকে তেমনি রাষ্ট্রেরও নাগরিকদের প্রতি দায়িত্ব অনেক বেশি। সেজন্য উন্নত বিশ্বে নাবালক ও বৃদ্ধ বয়সে নাগরিকদের কিছু দায়িত্ব রাষ্ট্র গ্রহণ করে। কোনো সম্পদ না জামিয়েও সে দেশে নির্ভাবনায় চলা যায়। চিন্তার কারণ হয় না যে, বৃদ্ধ বয়সে আমার দায়িত্ব কে নিবে। এজন্য উন্নত দেশে সাধারণ দুর্নীতিপ্রবণতা অনেক কম হয়ে থাকে। কারণ ব্যক্তিগত সম্পদ জমানোর তেমন দরকার পড়ে না। নাগরিকদের জন্য এমন স্বস্তিকর রাষ্ট্রকাঠামো কায়েম করা একদিনে সম্ভব হয় না। ধীরে ধীরে একটা পর্যায়ে পৌঁছানো যায়। মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়াকে সামনে রেখে এমন একটি কল্যাণ রাষ্ট্রের দিকেই বাংলাদেশ এগোতে চায়। সর্বজনীন পেনসন প্রবর্তন সে উদ্দেশ্যেরই প্রতিফলন। আমরা এই কার্যক্রমের সর্বতো সফলতা কামনা করি। শুরু হোক, তারপর বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে একে আরও সমৃদ্ধ করার সুযোগ থাকবে। সরকার যে পেনসন তহবিল গঠন করবেন সেখানে নাগরিকদের নির্ধারিত চাঁদার বাইরেও সরকারি কোষাগার থেকে নিয়মিত অনুদান দেয়ার ব্যবস্থা রাখতে হবে। এই পেনসন কার্যক্রমও সফল হবে যদি দেশের করফাঁকির ভয়াল সংস্কৃতির পরিবর্তন করা যায়। সমাজে বহু লোক দেখা যাবে যাদের অঢেল সম্পদ বিদ্যমান। কিন্তু তাদের আয়কর নথি ঘাটলে হতাশ হতে হবে। অপ্রত্যক্ষভাবে ভ্যাট ইত্যাদির মাধ্যমে নাগরিকরা প্রতিদিন যে কর দিয়ে থাকেন তারও সিংহভাগ সঠিকভাবে সরকারি কোষাগারে আসে না। সুতরাং বাজেটে যত ভালো কথাই থাকুক না কেন এই জায়গায় ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা না করা পর্যন্ত আর এগোনোর কোনো পথ পাওয়া যাবে না। এই ন্যায্যতা প্রতিষ্ঠা করা গেলে করযাগ্য আয়ের নিচে অবস্থানকারী ব্যক্তিদের নিকট থেকে বাধ্যতামূলক কর আদায়ের নির্মমতার দায়ভার থেকেও রাষ্ট্র রেহাই পাবে।