সদর উপজেলার জয়কলস ইউনিয়নের উজানীগাঁও রশিদিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের কাছে শহীদ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি গোরস্থান রয়েছে। স্থানীয় মুক্তিযোদ্ধা, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অনিসন্ধিৎসু ব্যক্তি ও গণমাধ্যমকর্মীদের বদৌলতে জানা গেছে ওই গোরস্থানে তিন জন ভিন্ন ধর্মাবলম্বী শহীদ মুক্তিযোদ্ধাকে সমাহিত করা হয়। প্রাপ্ত তথ্য মতে শহীদ তালেব উদ্দিন আহমদ, শহীদ কৃপেন্দ্র দাস এবং খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী নাম না জানা আরেক মুক্তিযোদ্ধার দেহাবশেষ ওখানে সমাহিত করা হয়। সকলের নিকট এটি প্রতিষ্ঠিত একটি সত্য। সরকারিভাবে এখানে তিন শহীদের নামে জাতীয় দিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি জ্ঞাপন করা হয়ে থাকে। সিলেট অঞ্চলের বিশিষ্ট সাংবাদিক আল-আজাদ এই গোরস্থানটি সংরক্ষণসহ নামফলক স্থাপনের জন্য শিক্ষামন্ত্রীকে অনুরোধ করলে মন্ত্রী এ বিষয়ে তড়িৎ ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাধ্যমিক শিক্ষা দপ্তরকে নির্দেশনা দেন। গত শুক্রবার স্থানীয় দৈনিক সুনামকণ্ঠের একটি সংবাদ থেকে জানা যায়, এলাকার কিছু সাম্প্রদায়িক মনোভাবাপন্ন ব্যক্তির বিরোধিতার কারণে ওখানে মন্ত্রীর নির্দেশনা মতে তিন মুক্তিযুদ্ধার নামফলক লাগানো যাচ্ছে না। বিষয়টি দুঃখজনক, অনভিপ্রেত ও ইতিহাসকে উল্টোপথে ধাবিত করার একটি অপপ্রয়াস মাত্র। আমরা এ বিষয়ে শিক্ষামন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।
কোন পরিকল্পনা কিংবা আয়োজন করে এই ভিন্ন ধর্মাবলম্বী তিন মুক্তিযুদ্ধাকে এক জায়গায় সমাহিত করা হয়নি। মূলত কাছাকাছি জায়গায় শহীদ হওয়ার কারণে স্থানীয় মুক্তিযুদ্ধা-জনতা তাদেরকে এখানে কবরস্থ করেন। মহান মুক্তিযুদ্ধ ধর্মীয় পরিচয়কে ছাপিয়ে জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে জাতিকে একটি সংহত জায়গায় পৌঁছে দিয়েছিল। ধর্ম যার যার রাষ্ট্র সবার এমন আকাক্সক্ষা এবং অসামপ্্রদায়িক মনোভাবকে জাগ্রত করা ছিল মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম উদ্দেশ্য। সুতরাং শহীদ তালেব ও কৃপেন্দ্রসহ আরেকজন নাম না জানা শহীদকে এক জায়গায় সমাহিত করা মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার একটি মূর্ত প্রতীক মাত্র। স্বাধীনতার পর আজ ৪৫ বছরের মাথায় এসে আমরা ওই জাতীয় যুদ্ধের অনেক আদর্শের ভূলুণ্ঠন ও বিচ্যুতি দেখেছি। একেবারে উল্টো অবস্থানও দেখে অভ্যস্ত। জনগণের মধ্যে ধর্মীয় বিবেচনায় বিভেদ-বিভাজনের মাত্রাটিও বাড়ছে। একই অঞ্চলের ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে আস্থার পরিবেশ হচ্ছে বিনষ্ট। এসবই মহান মুক্তিযুদ্ধের চেতনার পরিপন্থী। আজ আমাদের একটি অংশের মধ্যে এমন হীন মনোভাব তৈরি হয়েছে যে কারণে দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবনদানকারী তিন বীরের শেষ ঠিকানাকে পর্যন্ত জঘন্য সাম্প্রদায়িক মনোভাবের উপলক্ষ করে ফেলা হলো। যারা এরকম মনোভাব পোষণ করে এখানে শুধু শহীদ তালেবের ফলক স্থাপনের দাবি তুলছেন তাদেরকে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানার আহ্বান জানাই আমরা।
এসব বিষয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সক্রিয় ভূমিকা আমরা আশা করেছিলাম। কিন্তু দুঃখজনক সত্য হলো যে, বিচ্ছিন্নভাবে মুক্তিযোদ্ধারা তালেব-কৃপেশ ও নাম না জানা শহীদের স্মৃতিকে মুছে ফেলার অপপ্রয়াসের বিরুদ্ধে সোচ্চার হলেও সংগঠনগতভাবে মুক্তিযোদ্ধা সংসদের ভূমিকা একেবারেই গৌণ। আমরা মনে করি ওই গোরস্থানের সঠিক ইতিহাসের আলোকে তাদেরকেই সর্বাগ্রে সামনে এগিয়ে আসা উচিত ছিল। সকলের মনে রাখা দরকার বর্তমান বিশ্ব বাস্তবতায় আন্তদেশীয় সম্প্রদায় বিশেষের মধ্যে যত বেশি বিভাজন বাড়বে তত ওই দেশটি নানাভাবে পিছিয়ে পড়বে। আর জনসমষ্টির মধ্যে সংহতি, আস্থা, বিশ্বাস ও সম্প্রীতি তৈরি হলে দেশ দ্রুত সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। তাই মুক্তিযুদ্ধের সময়ে স্থাপিত সম্প্রীতির এমন একটি অনুপম দৃষ্টান্তকে আমরা ক্ষুদ্র চিন্তা দিয়ে বিনষ্ট করতে চাই না। বরং এর মধ্য দিয়ে আমরা নিজেদের মহান আকাক্সক্ষার কথাই সারা বিশ্বকে জানিয়ে দিতে চাই যা মানুষে মানুষে ধর্ম, বর্ণ কিংবা সম্প্রদায়গত পরিচয়ের উর্দ্ধে এক অটুট ভ্রাতৃত্ববোধের বৈশিষ্টকে ধারণ করে।

