বিশেষ প্রতিনিধি
দোয়ারাবাজারে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন বঞ্চিত বর্তমান ৫ চেয়ারম্যান ঢাকা থেকে ফিরেই রবিবার স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসাবে নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছেন। এরা হলেন- দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আব্দুল খালেক, লক্ষীপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক মো. আমিরুল ইসলাম, নরসিংপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আওয়ামী লীগ নেতা মো. হাবিবুর রহমান, বোগলা বাজার ইউনিয়নের চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের কার্যকরি কমিটির সদস্য আহমদ আলী আপন, উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক দোহালিয়া ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আব্দুল জলিল। তবে মনোনয়নবঞ্চিত বাংলাবাজার ও মান্নারগাঁও ইউনিয়নের বর্তমান চেয়ারম্যান জসিম উদ্দিন ও মোহাম্মদ আলী খানের নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোন ঘোষণা পাওয়া যায়নি। এই ইউনিয়নগুলোয় তৃতীয় দফায় ২৩ এপ্রিল নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।
দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক পর পর ৩ বারের চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক দলীয় মনোনয়ন পাননি। এই অবস্থায় শনিবার আওয়ামী লীগের ধানমন্ডির কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে বাড়ী আসার সময় শনিবার রাতেই পাশের উপজেলা ছাতক থেকে তাঁর সমর্থকরা মোটর সাইকেল শোভাযাত্রা করে দোয়ারাবাজারে নিয়ে আসে তাঁকে। বাড়ী এসে সমর্থকদের উপস্থিতিতেই তিনি নির্বাচন করার ঘোষণা দেন।
ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুল খালেক বলেন,‘দলের জন্য ৩০ বছর ধরে কাজ করছি, গত ১৫ বছর ধরে ঈদের দিনেও মানুষের সঙ্গে থেকেছি, কাজ করার চেষ্টা করেছি, আমাকে দলীয় মনোনয়ন না দেবার বিষয়টি দলীয় কর্মীরা মানতে পারেনি, দলীয় নেতা কর্মীরা বলছেন-‘আাপনি নির্বাচন করেন, আপনি জিতবেন এবং দলও আপনার বিষয়টি ইতিবাচক ভাবেই নেবে, দলীয় মনোনয়নের সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল, সেটিও বুঝবে’।
উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক, লক্ষীপুর ইউনিয়নের দুই বারের চেয়ারম্যান আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘আজ (রবিবার) সকালে ঢাকা থেকে দোয়ারাবাজারে ফিরলে আমার সমর্থকরা উপজেলা সদরেই বিক্ষোভ মিছিল করেছে এবং তারা বলেছে দলীয় মনোনয়ন যাকে দেওয়া হয়েছে, সে বিএনপি থেকে দলে এসেছে, তার হাতে আমাদের নৌকা নিরাপদ নয়। আমাকে প্রার্থী হবার জন্য চাপ দিচ্ছে তারা, আমি বলেছি সকলকে নিয়ে তাদের মতামতের ভিত্তিতেই আমি সিদ্ধান্ত নেব, এজন্য আগামী মঙ্গলবার আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের সভা ডেকেছি’। তিনি নির্বাচনে প্রার্থী হবার পক্ষে ইতিবাচক মন্তব্য করেন।
দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য, উপজেলার বোগলাবাজার ইউনিয়ন চেয়ারম্যান আহমদ আলী আপনও রবিবার সকালেই দলীয় নেতাকর্মীদের সভায় নিজের প্রার্থীতা ঘোষণা করেছেন।
আহমদ আলী আপন বলেন,‘স্থানীয় আওয়ামী লীগ, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, শ্রমিক লীগ, যুব লীগ ও ছাত্র লীগ সকলেই বলেছে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার সিদ্ধান্ত ভুল হয়েছে। আমাকে প্রার্থী হবার জন্য তারা চাপ দেওয়ায়, আমি ঘোষণা দিয়েছি নির্বাচন করবো’।
উপজেলার নরসিংপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মো. হাবিবুর রহমান বলেন,‘আমি ৪ বারের চেয়ারম্যান, আমি রাষ্ট্রপতি পুরস্কারপ্রাপ্ত। নেপালে স্থানীয় সরকার প্রতিনিধিদের একটি সম্মেলনে দুইজন ইউপি চেয়ারম্যান অংশ নেবার সুযোগ ছিল, এর মধ্যে আমি ছিলাম। আমাকে দলীয় মনোনয়ন না দেওয়ায় দলের সকল পর্যায়ের নেতা কর্মীরা ক্ষুব্ধ। আমি আজ সন্ধায় দলের নেতাকর্মীসহ অন্য যারা দলীয় মনোনয়নের জন্য আবেদন করেছিলেন, সকলকে ডাকবো, সকলে বসে প্রার্থী কে হবে চূড়ান্ত করবো, দলের পক্ষ থেকে যাকে মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে, তাকে স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা গ্রহণ করবে না, আমরা সকলে মিলে স্বতন্ত্র প্রার্থী দেব’।
উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক দোহালিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল জলিল বলেন,‘আামি ছাত্র লীগ থেকে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে এসেছি। দলের মনোনয়ন না পেয়ে ঢাকা থেকে এসে আমি নিজে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছি, আমার কর্মীরাও হতাশ হয়েছে, কর্মীদের দাবী আমি যেন নির্বাচন করি, তারা কোনভাবেই মানছে না, এজন্য আজ (রবিবার) দুপুরে আমি নির্বাচন করার ঘোষণা দিয়েছি’।
দোয়ারাবাজার উপজেলা আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়ে গত দুই বছর ধরে বিভ্রান্তি রয়েছে। প্রায় ১৪ বছর আগে দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা এই উপজেলায় দলের আহ্বায়ক করে দেন জ্যেষ্ঠ আওয়ামী লীগ নেতা, বর্তমানে উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীককে। গত বছরের জানুয়ারি মাসে জেলা আওয়ামী লীগের (পুরাতন কমিটির) পক্ষ থেকে একবার গণমাধ্যম কর্মীদের জানানো হয় এই উপজেলায় নতুন কমিটি হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক ফরিদ আহমদ তারেক। কয়েকদিন পর আবার বলা হয় আগের কমিটিই বহাল আছে। এই বছরের ফেব্রুয়ারি মাসে একবার বলা হয় ইদ্রিছ আলী বীর প্রতীকই আহ্বায়ক, আবার ২ দিন পর বলা হয় ফরিদ আহমদ তারেকই আহ্বায়ক। গত ২৫ ফেব্রুয়ারি হওয়া দলের নতুন জেলা কমিটির সভাপতি এবং সম্পাদকের কথায়ও দোয়ারাবাজার উপজেলা আহ্বায়ক নিয়ে বিভ্রান্তি কাটেনি। নতুন সভাপতি মতিউর রহমান বলেন- ফরিদ আহমদ তারেক আহ্বায়ক, সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার এম এনামুল কবির ইমন বলেন ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক আহ্বায়ক। দলীয় মনোনয়ন প্রত্যাশীদের তালিকায়ও জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি এবং সম্পাদক যৌথ স্বাক্ষরে জমা দিতে পারেননি।
ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক এক তালিকা এবং ফরিদ আহমদ তারেক উপজেলার ৯ ইউনিয়নের আলাদা তালিকা জমা দিয়েছেন। বিদ্রোহী প্রার্থী হিসাবে ভোটের মাঠে থাকার ঘোষণা রবিবার যে ৫ বর্তমান চেয়ারম্যান দিয়েছেন, এরা ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীকের সমর্থক হিসাবে পরিচিত। এই ইউনিয়নগুলোয় শনিবার বিকালে আওয়ামী লীগের ধানমন্ডির কার্যালয় থেকে দলীয় প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে- দোয়ারাবাজার সদর ইউনিয়নে মো. আব্দুল হামিদ, বোগলাবাজার ইউনিয়নে মিলন খান, লক্ষীপুর ইউনিয়নে জহিরুল ইসলাম, নরসিংহপুর ইউনিয়নে খন্দকার আব্দুর রশিদ এবং দোহালিয়া ইউনিয়নে কাজী আনোয়ার মিয়া আনু দলীয় মনোনয়ন পেয়েছেন। এই ৫ জনের প্রথম ৪জন উপজেলা আওয়ামী লীগের একাংশের আহ্বায়ক ফরিদ আহমদ তারেকের সমর্থক। আনু ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীকের সমর্থক।
উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান আহ্বায়ক ইদ্রিছ আলী বীরপ্রতীক বললেন,‘নির্বাচনে প্রার্থী হওয়া না হওয়া এটি যার যার ব্যক্তিগত বিষয়’।
অপরাংশের আহ্বায়ক ফরিদ আহমদ তারেক বলেন,‘দলের সিদ্ধান্ত সকল পর্যায়ের নেতা কর্মীদেরই মানা উচিৎ, নির্বাচনে যেহেতু বিএনপিসহ অন্য দলেরও প্রার্থী থাকবে, আমাদের সকলেরই নৌকার পক্ষে থাকা জরুরি’।


