সজলকান্তি সরকার
‘মা লক্ষ্মীর বরে
ধন আইব ঘরে।’
ধন-ধান্যে ভরা এই বসুন্ধরায় বসতির শুরু থেকে কৃষিব্যবস্থায় ফসল উৎপাদনে বা রক্ষণাবেক্ষণে প্রকৃতির উপর নির্ভরতা সুরক্ষায় নানা লোকাচারের প্রচলন রয়েছে। বিশেষ করে হাওরাঞ্চলের একটিমাত্র ফসল-বোর ও শাইলগচি ধান চাষাবাদে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত নানা ব্রতাচার, মান্সিক, তন্ত্র-মন্ত্র ও শিন্নি প্রথার প্রচলন আছে। যেখানে ধানগাছের ‘গর্ভধারণ ব্রত‘ বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য। আঞ্চলিক ভাষায় যাকে ‘তেলউন্দা’ বা ‘তেলুন্দা’ বলা হয়। ‘তেলউন্দা’ শব্দটি ‘তেলসুন্দা’-এর আঞ্চলিক রূপ। অর্থাৎ তেল+সুন্দা=তেলসুন্দা। সুন্দা বা সুন্দি ‘মেতি’-এর প্রতিশব্দ। ধানগাছের গর্ভধারণ ব্রতে তেল ও মেতি মূল উপকরণ। তেল ও মেতি একত্র করে এ-ব্রতের মূল পর্ব সম্পন্ন হয়। তাই বলা যায়, তেল ও মেতি শব্দযোগে ‘তেলুউন্দা’ শব্দের উৎপত্তি।
হাওরাঞ্চলে হিন্দু ও আদিবাসী সমাজে ‘তেলুউন্দা’ ব্রতের বিশেষ প্রচলন রয়েছে। সাধারণত বসন্তকালে ফাল্গুণ মাসে দোলপূর্ণিমাকে কেন্দ্র করে একটি নির্দিষ্ট সময়ে এ-ব্রতের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হয়। দোলপূর্ণিমার পূর্ববতীর্ পনেরো দিন অর্থাৎ শুক্লপক্ষ এ-ব্রতের নিধার্রিত সময়। শুক্লপক্ষের রবি ও বৃহস্পতিবারে পঞ্জিকা মতে নির্দিষ্ট লগ্নে এ-ব্রত পালন হয়ে থাকে যখন ভাটি অঞ্চলে জমির ধানগাছ গর্ভধারনের উপযুক্ত হয়। রবি ও বৃহস্পতিবার ব্যতিত এ-ব্রত পালনের বিধান নেই। তাই দোলপূর্ণিমার পূর্ববর্তী রবি অথবা বৃহস্পতিবার ‘তেলুউন্দা’ ব্রতের সমাপ্তি ঘটে। এ-ব্রতের মাধ্যমে কৃষক-কৃষাণী ফসলের বীজধারণ ও পরিপক্ক হওয়ার দিনকাল ঘরে বসেই জানতে পারেন।
প্রাচীন কৃষিব্যবস্থায় আমরা মাতৃকাদেবীর উপাসনা লক্ষ্য করি যা প্রাগার্য জাতির মধ্যেও ছিল। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মে কৃষিভিত্তিক গ্রাম্য সমাজে মাতৃদেবী হিসেবে লক্ষ্মী ধন-সম্পদ ও শস্য-ভাণ্ডারের দেবী রূপে গুরুত্বপূর্ণ স্থান অধিকার করে আছেন। আর মানব মনের এই শাশ্বত বিশ্বাসগুলিই লোকাচারের জন্ম দিয়েছে। মানুষের আত্মগত, পরিবারগত, সমাজগত ও বিশ্বগত শান্তি কামনায় নানারকম লোকায়ত উপাসনা আজও প্রচলিত আছে যেখানে লক্ষ্মীদেবীর কৃপালাভে জমির একমাত্র ফসল রক্ষায় ‘তেলুউন্দা’ ব্রত আত্মগত থেকে বিশ্বগত শান্তিতে শস্য-সম্পদ লাভের উপাসনা। আর এ উপাসনার সময়কাল থেকেই জমির ধানগাছ গর্ভধারণ হতে শুরু করে। ধানগাছের এ-গর্ভবতী অবস্থাকে আঞ্চলিক ভাষায় ‘থউর’ বলা হয়।
‘তেলুউন্দা’ একটি আদি প্রথা। প্রাচীন জমানায় মন্দির-মসজিদ কেন্দ্রিক ভগবান-আল্লাহ পাওয়ার বিশ্বাসী লোকের সংখ্যা কম ছিল। অন্তরে নিরঞ্জনের বাস-এ বিশ্বাসেই তারা প্রভুকে নিজের মতো করে ভাবতে পারতো যে কোনও রূপে যে কোনও স্থানে। শুধু উলুধ্বনি কিংবা আজানের ঘরে বসেই শুধু তারা নিরঞ্জনের তালাস করতো না। প্রকৃতির মাঝে কিংবা বসত ঘরেই স্থাপন করে নিতো তাদের প্রভুর আসন। আর তারই ধারাবাহিকতায় হিন্দু সমাজে বসত ঘরের ঈশান কোনের একটি খুটিকে কেন্দ্র করে স্থাপিত হয় ধনের দেবী লক্ষ্মীসহ প্রভুর আসন। যে খুটিটি ‘মধুমপালা’ নামে উপাসনার প্রতিক। আর ‘মধুমপালা’-কে কেন্দ্র করে মাতৃদেবী লক্ষ্মীর নিকট জমিনের শস্য-সম্পদ লাভের জন্য ব্রত পালনের প্রচলিত রূপই তেলুউন্দা ব্রত নামে প্ররিচিত। তবে এ-ব্রত একই সময়ে একই নিয়মে সকলের কল্যানে বহুজনে পালন করে বিধায় তাকে ‘বারোয়ারী’ ব্রত বলা যায়।
সাধারণত: সধবা বা কুমারী মেয়েরা উপবাস থেকে এ-ব্রত পালন করে। ঘরের ‘মধুমপালা’কে কেন্দ্র করে এ-ব্রতের প্রাথমিক ক্রিয়াদি শুরু হয়। ‘মধুমপালা’য় স্থাপিত ধনদেবী লক্ষ্মীকে এ-ব্রতের মাধ্যমে ধানি জমিনে আহ্ববান করা হয়। ঘরের মধুমপালা থেকে ভিটা, বারান্দা ও বাড়ির উঠোন হয়ে বাহির মুখি জমিন বরাবর সাদা আলপনা এঁকে দেবীর গমনের পথ তৈরী করা হয়। এ-আলপনাকে আঞ্চলিক ভাষায় ‘আড়ক’ বলে। ‘আড়ক’-এর ফাঁকে ফাঁকে মধুমপালা থেকে জমিনমুখী দেবী গমনের পদচিহ্নও শোভা পায়। ব্রতী উপবাস থেকে গাইল-ছিয়ায় আতপ চাল কুটে মিহি করে তাতে পানি মিশিয়ে ‘আড়ক’ আঁকার উপাদান তৈরি করে। উলুধ্বনি দিয়ে হাতের আঙুলের সাহয্যে ‘আড়ক’ আঁকার কাজ শুরু হয়। এ-দিন গৃহস্থ শুধু সংযমই পালন করে না, আর্থিক লেনা-দেনা থেকেও বিরত থাকে। ‘আড়ক’-এর নান্দনিকতার বিষয়টি গ্রামবাসীর মাঝে প্রশংসিত ও আলোচিত হয়। আঁকিয়েদের তারিফ হয়। তাই দৃষ্টিনন্দন ‘আড়ক’ আঁকতে ব্রতীগণ ‘আড়কশিল্পী’ রূপে প্রতিযোগি হয়ে ওঠে।
ধান, দুর্বা, তিল, তুলসিপাতা, ফুল ও আমের পল্লবসহ ঘটিতে জল ভরে সিঁদুর ফোটা দিয়ে তিনবার উলুধ্বনির পর মধুমপালার কাছে ‘জলঘট’ স্থাপন করা হয়। অন্ন ও পঞ্চব্যঞ্জন (নিরামিষ) দিয়ে কলা পাতায় তিনটি, পাঁচটি, সাতটি অর্থাৎ বেজোড় সংখ্যক ‘ভোগ’ নিবেদন করা হয়। ক্ষীর, চিতলপিঠা(আতপ চালের সেদ্ধ পিঠা)সহ নানা রকম পিঠাও ‘ভোগ’-এ দেওয়া হয়। আঞ্চলিক ভাষায় ‘ভোগ’কে ‘থাইত’ বলা হয়। লক্ষ¥ীদেবীর জন্য ‘ছাতুদানা’ দিয়ে আলাদা একটি ‘থাইত’ কোলায় নিবেদন করে বিশেষ ভাবে ঢেকে রাখা হয় ব্রত শেষ না হওয়া পর্যন্ত। একটি নিদ্দির্ষ্ট সময় পর্যন্ত দেবীর ভরণ পোষণের জন্য খাদ্যদানা, সোনারূপা ও অর্থকড়িও নিবেদন করা হয়। ব্রতের উপকরণ হিসেবে তেল ও মেতি একত্রে মিশিয়ে সংরক্ষিত পাত্রে দেওয়া হয় যা ধানগাছের গর্ভধারণ ব্রতের মূল উপাচার ‘তেলসুন্দা’।
একটি নির্দষ্ট লগ্নে ব্রতী শুধু ক্ষীর-পিঠার ‘থাইত’, তেল-সুন্দা, ধান-দুর্বা, তেল-সিন্দুর, খাবার পানি ও বটিদাসহ নিকটবর্তী নিজস্ব জমিনে দেবীকে স্থাপন করেন। জমির আইল পরিষ্কার করে তাতে দা দিয়ে আড়া-আড়ি দাগকেটে উলুধ্বনি দিয়ে ক্ষীর-পিঠার ‘থাইত’ দেওয়া হয়। শস্য-সম্পদের মালিক দেবীর কাছে অর্পণ করা হয় ধানগাছের গর্ভধারণ ও ধানিজমি রক্ষণাবেক্ষণের দায়। ধানগাছের গা ধুইয়ে দিয়ে ব্রতী তার সঙ্গে সইসম্বন্ধ স্থাপন করে এবং পাতা বেঁধে দিয়ে পরস্পরে বন্ধন তৈরী করে। ধানগাছ গর্ভবতী হওয়ার জন্য পাতায় লাগিয়ে দেওয়া হয় ‘তেলসুন্দা’ মিশ্রণ। দেওয়া হয় সিঁদুরের পাঁচটি ফোঁটা। দেবীর কাছে অর্পণ করা হয় গর্ভবতী ধানগাছের পরিপক্ক হওয়া পর্যন্ত লালন পালনের ভার। দেবীকে প্রার্থনা করে বলা হয়-
‘মা লক্ষ্মীর বরে
ধন আইব ঘরে’।
ব্রতের আনুষ্ঠানিকতা শেষে জমিনে উপস্থিত সকলের মাঝে ক্ষীর-পিঠা দেবীর প্রসাদ হিসেবে বিতরণ করা হয়।
জমিনের আনুষ্ঠানিকতা শেষে ব্রতী বাড়ি ফিরে প্রথমে লক্ষ্মীর ‘থাইত’টি প্রসাদ হিসেবে সবার মাঝে বিতরণ করে ও নিজে খেয়ে উপবাস ভঙ্গ করে। তারপর বাকি ‘থাইত’গুলো বাড়ির লোকজন বা প্রতিবেশিদের মাঝে বিলিয়ে দেওয়া হয়। অন্ন-ব্যঞ্জনে সুস্বাদু এ-‘থাইত’ খেতে বাড়ির ছোটো ছেলে-মেয়েরা যেন সকাল থেকেই ক্ষুধার্ত হয়ে থাকে। গিমাইশাক(তিতাশাক), কাঁচামরিচের বড়া, বাঙ্যনের বড়া, মুলা-আলু-লাউ-ডেঙা-উশ্যি দিয়া কলার থউরের লাবরা আর খিচআলু ভাজির সাথে মুগডাইলের ‘থাইত’ খাওয়ার ঢেকুর উডে। ঘরে-ঘরে প্রতি বারে-বারে বর্তের সারা পরে। গাঁয়ের সকলেই ধানি জমিনের লাগ্যিয়া চু’মন্ত্র আর তাবিজ-কবজ লইয়া কাজ শুরু করে। আইড়াকোনা দিয়া ‘হাঁঝ’ করলে ‘শিলান্ত’ সাধক ‘হিরাল’-রে ডাকে জান-পরাণ দিয়া। ছাত্তি টাঙাইয়া ‘আওর’ যায় না ‘হিল’ পড়ার ডরে। জমিনে ‘ঝান্ডা’ দেয় নজর লাগবো বলে। বার বুজ্জিয়া কাপড় ধওয়ন, চুল ধওয়ন ছাড়াও আরও কত যে নিয়ম আছে তার সীমা নাই। শনি মঙ্গল বারে ধার-কর্জ তো দূরের কথা ভিক্ষা দিলেই মহাভারত অশুদ্ধ হইয়া যায়। মনে হয় যেন একটা ফসলের লাগি পুত্র লাভের মতো কাউছালি শুরু হইছে। ভাটির মানুষ কথায় কথায় কয়-
‘এক করলে পুত
আর’এক করলে জুত’।
এই রকম করতে করতেই জমির ধানে চাউল ভর করে, রঙ ধরে, সোনাসোনা রূপ ধরে। খুশিতে তখন শুধু গলা ভরে গান হয়। কান পাতলেই আতারে-ফাতারে রাগিণী শুনা যায়। মহিলারা ধামাইল গায়। তখন থেকেই গুছি আর কাঁচির হিসাবটা মা-খুড়ি সকলেই করতে থাকে। খিলক্ষেত, পেট্যুয়াক্ষেতসহ সকল ক্ষেতের হিসাব তারা ঘরে বসেই রাখে। আঙুলে আঙুলে গুণে ধান কাটার হিসাব-
‘তেলুন্দার দশে,
ধান আয় শীষে’।
অর্থাৎ তেলুন্দার দশ দিন পরেই ধানে ‘হিজা’(শীষ) ছাড়ে। এরপর শুরু হয় অন্য অংক-
‘শীষে বিশ
নুয়াইলে বারো,
শাইল গচি বোরো
কাটতে পার’।
তেলুউন্দা বর্ত অনেকের কাছে নাইকাম মনে হইলেও-অহেতুক না। ধানের এই হিসাবের কোন লড়চড় হয় না। হিসাব মতোই ‘দাওয়া’(ধানকাটা) শুরু হয়। পরে আবার আরেক ব্রত, উল্টা আড়কে লক্ষ্মীদেবীকে ঘরে আনার বর্ত। শেষ কথা হলো- একটা ফসলের লাগি হাওরের সিদাসাধা মানুষগুলো কতোকিছু যে করে তার কোনো দাড়িকমা নাই।
লেখক: সজলকান্তি সরকার।


