‘ধান খুব ভালা হইছে’

বিশ্বজিত রায়, হাওর থেকে ফিরে
‘ধান খুব ভালা হইছে। কিয়ার প্রতি ২০-২২ মণ দর পড়ছে। আমার ৮০ কিয়ারের মধ্যে প্রায় ৫০ কিয়ার কাটা হইয়া গেছে। সব মোটা ধান দিছি। আগামী তিন দিনের মধ্যে বাকি ৩০ কিয়ারও কাইট্যালাইমু। সবকিছু মিলাইয়া আমরার হাওরের প্রায় ৬০ পার্সেন্ট কাটা হইয়া গেছে। আর এক সপ্তাহ রইদ দিলে হাওরে কিচ্ছু থাকত নায়।’ কথাগুলো বলেন, জামালগঞ্জের পাগনা হাওর পারের সুজাতপুর গ্রামের কৃষক সোহাগ মিয়া।
একই হাওর পারের আলীপুর গ্রামের কৃষক মো. আসাদ আলী জানিয়েছেন, এ বছর ৬০-৭০ কিয়ার জমি করা হয়েছে তার। ধান পাবেন প্রায় হাজার মণ। ২৮ ও ২৯ জাতের ধান যদিও একটু খারাপ হয়েছে, তবে অন্য জাতের ধান ভালো হওয়ায় সে অপূর্ণতা কেটে গেছে। খরা দেওয়ায় কাটাই-মাড়াইসহ শুকিয়ে সুন্দরভাবে ধান ঘরে তুলতে পারছেন তারা।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, অনেকে আর্থিক প্রয়োজনে খলা থেকেই ৮৫০-৯০০ টাকা দরে ধান বিক্রি করে দিচ্ছেন। গুদামে গিয়ে কৃষকদের অনেক জোট-ঝামেলায় পড়তে হয়। তাই মণপ্রতি ২০০-৩০০ টাকা কম দামে ধান বিক্রি করছেন কৃষকেরা।
সোনালী ফলনে ভরে যাচ্ছে কৃষকের ঘর ও গোলা। হাওরের উপচেপড়া সোনালী ধান হাওরাঞ্চলের মাঠ ময়দানের চাকচিক্য বাড়িয়ে তুলেছে। বছরের একটিমাত্র ফসল বোরোর বাম্পার ফলনে কৃষক পরিবারে বইছে ফুরসতহীন আনন্দ। নতুন ধানের টানে ঘর ছেড়ে হাওরেই দিন কাটাচ্ছে অগণিত কৃষক-কৃষাণী ও তাদের সন্তান-সন্তুরিরা। সদয় প্রকৃতি বরাতে বিরামহীন কর্মব্যস্ততা বিরাজ করছে গোটা হাওর। হাওরজুড়ে স্বর্ণালী উৎসবের আমেজ চোখে পড়েছে।
মনানন্দে হাওর দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কৃষক-শ্রমিক সকলে। ঘরে-বাইরে সবখানেই ফসল তোলার জোর হাঁকডাক শোনা যাচ্ছে। তুষ্টিদায়ক ফলনে মন ভরে উঠেছে কৃষক পরিবারের। ফলনে টইটুম্বুর জামালগঞ্জের হালি, মহালিয়া ও শনি হাওরের একাংশ ঘুরে তুষ্টিদায়ক রেশ পরিলক্ষিত হয়েছে।
কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী জামালগঞ্জের হাওরে ধান কাটা হয়েছে ৮৩ ভাগ। তবে ভিন্নমত কৃষক ও হাওর আন্দোলনের নেতাদের। তাদের দাবি হাওরে ধান কাটা হয়েছে গড়ে ৭০ ভাগ।
হাওর ঘুরে দেখা যায়, ফলন ঘরে তুলতে মহাব্যস্ত সময় পার করছে ছেলেবুড়ো সকলে। প্রচ- রৌদ্রতাপ উপেক্ষা করে কেউ ধান মেলে তাতে পা বুলাচ্ছে, কেউ শুকনো ধান টেনে এক জায়গায় স্তুপ করছে, কেউ ধান উড়িয়ে বস্তাবন্দী করে বাড়ি নিয়ে যাচ্ছে, কেউ কেউ খরের গাদা দিচ্ছে। অনেকে আবার ক্ষেতের ধান কেটে নির্ধারিত স্থানে জড়ো করছে। এতে করে নারী-পুরুষের সমান অংশগ্রহণে প্রাণচাঞ্চল্যতায় রূপ নিয়েছে সমগ্র হাওর। হালি ও মহালিয়াসহ শনি হাওরের একাংশে প্রায় ৭০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয়েছে। এর আশেপাশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা ছোট হাওরগুলোতে ইতিমধ্যে ৫০ থেকে ৬০ ভাগ ধান কর্তন হয়েছে। এছাড়া উপজেলার আরেক বৃহত্তম হাওর পাগনার ধান কর্তন প্রায় ৬০ ভাগ এগিয়েছে বলে জানা গেছে।
উপজেলা হাওর বাঁচাও আন্দোলনের নেতাদের সাথে কথা বলে জানা যায়, এ বছর বাম্পার ফলন হয়েছে হাওরে। পাগনা হাওরে বৃহস্পতিবার পর্যন্ত প্রায় ৬০ ভাগ এবং হালি, শনি ও মহালিয়া হাওরে প্রায় ৮০ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। পাগনা হাওরের অধিকাংশ জমি অসমতল এবং অপেক্ষাকৃত নীচু জমিগুলো সাম্প্রতিক বৃষ্টির কবলে পড়ে জলাবদ্ধতার শিকার হওয়ায় এতে কম্ভাইন্ড হারভেস্টার মেশিন দিয়ে ধান কাটা সম্ভব হচ্ছে না। যে কারণে কৃষকেরা অধিক অর্থ খরচায় শ্রমিক দিয়ে ধান কাটতে বাধ্য হচ্ছেন। এ রকম অবস্থা শুধু পাগনা হাওরেই নয়। উপজেলার ছোটখাট অনেক হাওরের পাকা ধান কাটতে গিয়ে কৃষকেরা ধান কাটা শ্রমিকের কায়দা-কৌশল মেনে নিতে বাধ্য হচ্ছেন। তবে অধিক অর্থ ব্যয় করে হলেও সময়মতো ধান ঘরে তুলতে পারার স্বস্তি আছে কৃষকের মাঝে। আর যদি সপ্তাহখানেক প্রকৃতি সদয় হয় তাহলে জামালগঞ্জে প্রায় শতভাগ ধান কাটা হবে বলে জানিয়েছে কৃষকসহ অনেকে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, আজ (বৃহস্পতিবার) পর্যন্ত প্রায় ৮৩ ভাগ ধান কাটা হয়েছে। তিন-চারদিনের মধ্যে তা শতভাগে পোঁছবে। নন হাওরে বিক্ষিপ্তভাবে যা থাকবে তা শেষ হতে সপ্তাহ-দশদিন সময় লাগতে পারে। বৃষ্টির সম্ভাবনা আপাতত না থাকায় সুন্দরভাবে দাওয়া-কাটা শেষ হবে। চলতি বছর বোরো আবাদ হয়েছে ২৪ হাজার ৪৭০ হেক্টর জমি। আবাদকৃত জমিনে এ বছর ১ লাখ ৫২ হাজার ২৯৭ মেট্রিক টন ধান উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, ফলন এবার যথেষ্ট ভালো হয়েছে। ব্রি ২৮ ও ২৯ একটু খারাপ হয়েছে। এ জাতের ধান যারা পরে লাগিয়েছে তাদের ভালো হয়েছে। যারা আগেভাগেই রোপণ করেছে তাদের খারাপ হয়েছে। সর্বসাকুল্যে ভালোই হয়েছে। সরকার ১২শ’ টাকা দরে ধান কিনবে। স্ব-স্ব ইউনিয়ন পরিষদ থেকে অনলাইনে খাদ্য বিভাগের অ্যাপস থেকে ২৫ তারিখ থেকে ধান ক্রয়ের আবেদন শুরু হয়েছে। কৃষক ইউনিয়ন পরিষদে গিয়ে আবেদন করতে পারবেন। এখানে কোন নয়ছয়ের সম্ভাবনা নেই। ময়েশ্চার মিটারে ধান ১৪ শতাংশ ময়েশ্চারাইজড থাকলে তা ক্রয় উপযোগী হবে। এর বাড়তি হলে ধান গুদামজাত করতে সমস্যা হবে।