বিশেষ প্রতিনিধি
‘জরুরি দরকারে ৯৫০ টাকা মণ হিসাব কইরা বুধবারে ৫০ মন ধানের টেকা লইছি, আজকে (বৃহস্পতিবার) খলা থাকি ২৯ জাতের ধান ৪২ কেজিতে মণ মাইপ্পা দিমু, ইলাখান যারার দরকার বেশি ব্যাপারি’র টাইন থাকি টেকা লইলা খলাত (ধান মাড়াইয়ের জন্য হাওরের পাড়ে অস্থায়ী ডেরা) থাকিঔ মাইপ্পা বেচের।’
খলা থেকে কম দামে ফড়িয়াদের কাছে ধান বিক্রি করার বিষয়টি এভাবেই জানাচ্ছিলেন বিশ^ম্ভরপুরের আঙ্গারুলি হাওরপাড়ের ব্রজনাথপুরের কৃষক সুধাংশু বিশ^াস।
শাল্লার বড় কৃষক ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ছত্তার মিয়া বললেন, ‘হীরা ধান (মোঠা ধান) ৭৫০ থেকে ৮০০ টাকায় খলা থেকেই বিক্রয় করছেন প্রান্তিক কৃষকরা। কোন কোন ফড়িয়া ধান ভেজার অজুহাত দেখিয়ে দর কমানোর চেষ্টা করছে। অথচ, এইবারের কোন ধানই ভিজা নাই। গোডাউনে ধান কেনা শুরু হলেই ধানের দাম বেড়ে যেত। হীরা ধান প্রতি মণ ৯০০ থেকে ১০০০ টাকায় বিক্রয় করা যেতো।’
কেবল শাল্লা বা বিশ^ম্ভরপুরে নয় জেলার সকল হাওরে একই ধরণের চিত্র। ধান কাটানোর জন্য হারভেস্টার যন্ত্র বা শ্রমিকের মজুরি, দাদন ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে আনা ঋণের টাকা শোধসহ নানা প্রয়োজনেই ফড়িয়াদের খপ্পরে কৃষক।
শাল্লার কৃষক ছত্তার মিয়ার মতে খাদ্য গোদামে ধান যে পরিমাণই কেনা হোক, ১২০০ টাকায় যখন ৪০ কেজি ধান ক্রয় করবে খাদ্য গোদাম, ফড়িয়া বা আড়ৎদাররাও ৪০ কেজি ধান হাজার-১২শ’ টাকায় কিনবে তখন। এই অবস্থাটুকু তৈরি করে দিতে হবে সরকারকে। সরকার বিলম্ব করলে ফড়িয়া-আড়ৎদাররা কম দামে ধান কিনে গোদামজাত করবে।
বিশ^ম্ভরপুরের রাধানগরের রাইস মিল মালিক আব্বাস উদ্দিন বললেন, আমাদেরকে ফড়িয়ারা ব্রি- ২৯ জাতের শুকনা ধান ৪১ কেজিতে মণ দিচ্ছে ১০৮০ টাকা করে। ছোট ব্যবসায়ীরা খলা থেকে শুনেছি ৪১ ও ৪২ কেজিতে মণ কিনছে ১০৫০ টাকা করে। একটু ভিজা হলে ৪৩-৪৪ কেজিতে মণ কিনে শুকিয়ে আমাদের কাছে বিক্রয় করছে।
দিরাইয়ের রাজানগরের বড় কৃষক আব্দুস ছাত্তার জানালেন, বৃহস্পতিবার তার পাশের বাড়ির এক কৃষক ৭৫০ টাকা মণ দরে পাঁচ মণ হীরা ধান ফড়িয়ার কাছে বিক্রয় করেছেন। এই জাতের ধানই দিরাই-শাল্লাসহ ভাটি অঞ্চলে বেশি হয়। সরকারি গোদামে ধান কেনা শুরু হলে ১০০০ টাকা মণে ফড়িয়ারাই কিনতো হীরা ধান।
জেলার সবচেয়ে বড় ধান কেনা বেচার আড়ৎ মধ্যনগর। এই আড়তের আড়ৎদার গোপেশ সরকার বললেন, আমরা ধান কিনে আশুগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, মদনগঞ্জ ও চাঁদপুরের ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রয় করে থাকি। তারা যে দামে ধান কিনে এর থেকে প্রতি মণে ২০-২৫ টাকা কমে ধান কিনে থাকি আমরা। সরকার ধান কেনা শুরু করলে মহাজনরাও কিছু দাম বাড়াবে, আমরাও বাড়াতে পারবো। তার মতে খাদ্য গোদাম ধান কিনলে মধ্যনগরের ব্রি- ২৮ জাতের ধানের দাম ১১২০ থেকে ১১৫০ টাকা মণে বিক্রয় হবে।
মধ্যনগরে ধান কেনা বেচায় নৌ-পথ বা নৌ-পরিবহন কাজে লাগে এখনো। এই আড়তে এসময়ে জামালগঞ্জ, ধর্মপাশা, তাহিরপুর ও ধর্মপাশার একাংশের এবং মধ্যনগর উপজেলার কৃষকদের কাছ থেকে কেনা ধান ফড়িয়ারা বিক্রয় করেন। সোমেশ^রি, বৌলাই, ধনু ও সুরমা নদী দিয়ে ধানের ট্রলার পৌঁছায় মধ্যনগরে।
মধ্যনগর ধানের আড়ৎদার সমিতির সভাপতি জহিরুল হক বললেন, প্রতিদিন ২৫ থেকে ৩০ হাজার মণ ধান ক্রয় করছেন সমিতির ৩৪ জন আড়ৎদার। এই ধান বাল্কহেডে শানবাড়ি, জয়শ্রী, দৌলতপুর, গাগলাজোড়, ইটনা-মিঠামইন হয়ে ২৪ ঘণ্টায় আশুগঞ্জ পৌঁছায়। একইভাবে মুন্সিগঞ্জ ও মদনগঞ্জে যাচ্ছে দুই দিনে ধান বোঝাই বাল্কহেড। তিনি জানান, এখানকার ৭৫ ভাগ ধান আশুগঞ্জেই বিক্রয় হয়। ব্রি-২৮ জাতের ধান বৃহস্পতিবার ১০০০ থেকে ১০৭০ টাকা, ২৯ জাতের ধান ৯২০ থেকে ৯৮০ টাকায় কেনা হয়েছে। এই আড়ৎদার জানালেন, তাদের আড়তে ধান নিয়ে আসতে কৃষক কমই দেখা যায়। ফড়িয়ারাই ধান নিয়ে আসেন বেশি।
জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মইনুল ইসলাম ভ্ঞূা জানালেন, সুনামগঞ্জসহ ১০ জেলায় আগামী সাত মে ভার্চুযালি ধান কেনা উদ্ধোধন করবেন খাদ্যমন্ত্রী। ধান প্রতি কেজি ৩০ টাকা এবং চাল প্রতিকেজি ৪৪ টাকা কেজি দরে কেনা হবে। ধান কৃষকদের কাছ থেকে এবং চাল চুক্তিবদ্ধ মিলারদের কাছ থেকে কেনা হবে। কী পরিমাণ ধান-চাল কেনা হবে এই নির্দেশনা এখনো পাওয়া যায় নি।
প্রসঙ্গত, ১৯ এপ্রিল হাওরে ধান কাটা উৎসবে যোগ দিয়ে কৃষিমন্ত্রী আব্দুর রাজ্জাক ২৫ এপ্রিল থেকে ধান কেনা শুরুর কথা বলেছিলেন। স্থানীয় সাংবাদিকদর প্রশ্নের জবাবে তিনি ঐ দিন এই তথ্য জানিয়ে ছিলেন। অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা মন্ত্রী এমএ মান্নান এমপি ও পানি সম্পদ উপমন্ত্রী এনামুল হক শামীমও উপস্থিত ছিলেন।


