প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা: দেশে কোনো মানুষ গৃহহীন থাকবে না

মোঃ রেজুয়ান খান
অতিমারি করোনার এই কঠিন সময়েও দিনরাত দেশের মানুষ আর দেশকে উন্নয়নের শিখরে নিয়ে যাওয়ার স্বপ্নে বিভোর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি সমাজের প্রান্তিক প্রকৃত গৃহহারা ভূমিহীনদের সামাজিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা প্রদানসহ সম্পূর্ণ বিনা খরচে পাকাঘরে তাদের পুনর্বাসন করেছেন। গৃহহীনদের আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করার পাশাপাশি তাদেরকে আত্মকর্মসংস্থানের সুব্যবস্থা করে দিয়েছেন। আশ্রয়স্থলে গৃহহীনদের জন্য নিরাপদ পানি ও বিদ্যুতের ব্যবস্থা নিশ্চিতসহ বিনোদন পার্ক, কৃত্রিম লেক, পাঠাগার তৈরি করে দিচ্ছেন।
ছিন্নমূল, গৃহহীন, আশ্রয়হীন মানুষের নির্ভরতা, আশা ও ভরসার ঠিকানা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানেরই প্রতিচ্ছবি তিনি। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্ন ছিল বাংলাদেশের মানুষকে ঘিরে। আশ্রয়হীনদের মাথা গোঁজার ঠাঁই, ক্ষুধার্ত মানুষের অন্নের সংস্থান, বস্ত্রহীনের জন্য বস্ত্র, একটি আদর্শ শিক্ষিত জাতি ও আর্তপীড়িত মানুষের চিকিৎসাসেবা প্রাপ্তি নিশ্চিত করার জন্যই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান আজীবন সংগ্রাম করেছিলেন, দেখেছিলেন সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন। এদেশের মানুষের সুখ ও স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য নিজের ব্যক্তিজীবনের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে বিসর্জন দিয়েছিলেন তিনি। তাঁরই জ্যেষ্ঠ কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সোনার বাংলাদেশকে বাস্তব রূপ দিতে বঙ্গবন্ধুর প্রতিচ্ছবি হয়ে সারাবিশ্ব বিচরণ করছেন। তাঁর গতিশীল ও দুরদৃষ্টিসম্পন্ন পরিকল্পনা বাংলাদেশকে অপ্রতিরোধ্য অগ্রযাত্রায় এগিয়ে নিচ্ছে।
১৯৭২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত তৎকালীন নোয়াখালী জেলার রামগতি এলাকা (বর্তমানে লক্ষ্মীপুর জেলা) পরিদর্শনে এসেছিলেন। সেখানকার গৃহহীন মানুষের কষ্ট তিনি নিজ চোখে দেখেছেন। বঙ্গবন্ধু সেখানকার ২০০ ক্ষতিগ্রস্ত গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের জন্য ২০০টি ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন। নির্মিত ঐ ঘরগুলোকে বঙ্গবন্ধু পোড়াগাছা ‘গুচ্ছগ্রাম’ নামে অভিহিত করেছিলেন। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্দেশে ঐবছরই বৃহত্তর নোয়াখালীতে আরও ৪টি গুচ্ছগ্রাম তৈরি করে ১ হাজার ৪৭০টি ছিন্নমূল গৃহহারা পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছিল। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান পরকিল্পতি নগরায়ণ ও সবার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত বাসস্থান নিশ্চিত করতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছিলেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঘোষণা দিয়েছেন, দেশে কোনো মানুষ গৃহহীন থাকবে না। বাংলাদেশের কোনো মানুষ আশ্রয়হীন থাকবে না তা নিশ্চিত করাই তাঁর সরকারের লক্ষ্য। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ন্যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সবসময়ই বিভেদ, বৈষম্য ও শোষণের বিপরীতে ছিলেন। তিনি ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি, গোত্রে কোনো বৈষম্য রাখেননি। প্রকৃত গৃহহীনরা আশ্রয়ণ প্রকল্পের উপকারভোগী হিসেবে গণ্য হবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা প্রকৃত গৃহহীন মানুষকে পুনর্বাসনের জন্য সরকারি খরচে ঘর তৈরি করে দিতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের প্রতি নির্দেশ দিয়েছেন।
সারাদেশে ৮ লাখ ৮৫ হাজার ৬২২ জন গৃহহীন পরিবারের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। প্রকৃত গৃহহীন তালিকায় রয়েছে ভিক্ষুক, প্রতিবন্ধী, বিধবা, স্বামী পরিত্যক্তা, হিজড়া ও ষাটোর্ধ্ব প্রবীণ ব্যক্তি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশে ১৯৯৭ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩ লাখ ৭৫ হাজার গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। প্রত্যেক গৃহহীন পরিবার বিনামূল্যে বাড়িসহ দুই শতক জমির মালিকানা লাভ করে। প্রতিটি বাড়িতে দুটি বেডরুম, একটি কিচেন রুম, একটি ইউটিলিটি রুম, একটি টয়লেট ও একটি বারান্দা রয়েছে। সরকার জুলাই-২০১০ থেকে পরবর্তী ১২ বছর অর্থাৎ ২০২২ সালের মধ্যে আরও ২ লাখ ৫০ হাজার ছিন্নমূল, গৃহহীন পরিবারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে কাজ করছে। রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য নোয়াখালী জেলার হাতিয়া উপজেলার ভাসানচরে আরও ১ লাখ ঘর নির্মাণ কাজ শেষ হয়েছে।
-২-
১৯৯৭ সালের ১৯ মে প্রাকৃতিক দুর্যোগে কক্সবাজার জেলা ও তৎসংলগ্ন উপকূলীয় এলাকাগুলোতে অসংখ্য মানুষ গৃহহারা হয়ে পড়ে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঐসময়ে তাৎক্ষণিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনে যান এবং ক্ষতিগ্রস্ত গৃহহারা মানুষের আর্তনাদ ও দুঃখদুর্দশা কাছ থেকে দেখেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহহারা উদ্বাস্তু মানুষদের পুনর্বাসন করার জন্য ১৯৯৭ সালে ‘আশ্রয়ণ’ প্রকল্প গড়ে তোলেন। দেশের গৃহহীন ও ছিন্নমূল মানুষ পুনর্বাসনের লক্ষ্যে প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে ‘আশ্রয়ণ’ প্রকল্পটি পরিচালিত হয়। প্রাথমিকভাবে জলবায়ু উদ্বাস্তু ভূমিহীন, গৃহহীন ৪ হাজার ৪০৯টি ছিন্নমূল দরিদ্র পরিবারকে পুনর্বাসনের লক্ষ্যে সরকার আশ্রয়ণ প্রকল্প গ্রহণ করে। লক্ষ্য ছিল পুনর্বাসিত পরিবারগুলোকে এক প্ল্যাটফর্মে রেখে পরিবেশ সহনশীলতা ও অভিযোজন ক্ষমতা বৃদ্ধি করা। এছাড়া উদ্বাস্তু পরিবারগুলোকে আয়বর্ধক কর্মকা-ে সম্পৃক্ত করে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে দেওয়া। এ লক্ষ্য বাস্তবায়নে প্রাথমিকভাবে সমুদ্রতীরবর্তী এলাকা কক্সবাজারের খুরুশকূলে ২০টি পাঁচতলা ভবন নির্মাণ করে সেখানে ৬০০ উদ্বাস্তু পরিবারকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। সরকারের অর্থায়নে সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ভূমিহীন, গৃহহীন, ছিন্নমূল পরিবারের স্বামী-স্ত্রী উভয়ের যৌথ নামে ভূমির মালিকানা সত্ত্বেও কবুলিয়ত দলিল সম্পাদন, রেজিস্ট্রি ও নামজারি করে দেওয়া হচ্ছে।
আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুনর্বাসিত উপকারভোগীদের সমবায়ের মাধ্যমে নিবন্ধিত করে স্বল্পমেয়াদি ও দীর্ঘমেয়াদি প্রশিক্ষণ প্রদানের ব্যবস্থা রয়েছে। কুটিরশিল্প, মৎস্যচাষ, নার্সারি, হস্তশিল্প, মৃৎশিল্প, পোশাক তৈরিতে হাতের সেলাই ও দর্জি কাজের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ এর অন্তর্ভুক্ত। উপকারভোগীদের দক্ষ জনশক্তি ও স্বাবলম্বী হিসেবে গড়ে তোলাই হচ্ছে এ প্রশিক্ষণের মূল উদ্দেশ্য। গ্রামীণ উন্নয়নে প্রত্যেক ঘরে বিদ্যুৎ ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। আশ্রয়ণ প্রকল্পে পুনর্বাসিত উপকারভোগীরা সরকারি সকল প্রকার সুযোগ সুবিধা ভোগ করতে সক্ষম হচ্ছে। পুনর্বাসিত পরিবারের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করে এ প্রকল্প দারিদ্র্যমোচনে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে।
লাখ লাখ গৃহহীন মানুষের জন্য ঘর তৈরিসহ পুনর্বাসন করার মতো নজির পৃথিবীতে আর একটি আছে বলে আমার জানা নাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের প্রতিটি গৃহহীন মানুষকে পুনর্বাসন করার মহতি উদ্যোগ নিয়ে সারাবিশ্বে উন্নয়নের রোল মডেল রচনা করেছেন। তাঁর গৃহীত এ উদ্যোগ আর প্রচেষ্টা সকলের সম্মিলিত সহযোগিতায় একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়তে সক্ষম হবে। এভাবেই জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ার স্বপ্ন সফল হবে।
২৭.১০.২০২১ পিআইডি ফিচার