বন্দি মুজিব ও ঐতিহাসিক পত্র

ড. আবু সাইয়িদ
১৫ ডিসেম্বর ১৯৭১। বাংলাদেশ সবেমাত্র স্বাধীন হতে যাচ্ছে। ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনকে একটি অতি জরুরি বার্তা পাঠান। ওই বার্তায় ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘আমি এমন এক সময় আপনাকে চিঠি লিখছি, যখন ভারত-আমেরিকার মধ্যে সম্পর্কের ক্ষেত্রে কিছুটা অসুবিধাজনক অবস্থা তৈরি হয়েছে। সেহেতু আমি আপনাকে ধৈর্যের সঙ্গে গোড়া থেকেই পুরো ব্যাপারটি নিয়ে ভাবতে অনুরোধ করছি। এমন কিছু কিছু সময় আসে যখন বর্তমানের গভীর সংকটকে অতীতের কিছু মহৎ ঘটনাবলি দিয়ে আলোকিত করতে হয়। তেমনি একটি ঘটনা আমেরিকা কর্তৃক তার ঐতিহাসিক স্বাধীনতার ঘোষণার জন্য লাখ লাখ মানুষ মৃত্যুর জন্য প্রস্তুত হয়েছিল। সেই ঘোষণায় বলা হয়েছিল, যখন কোনো সরকার তার জনগণের অধিকারের ক্ষেত্রে ক্ষতিকর বিবেচিত হয়, তাকে ধ্বংস করার ক্ষমতা সে দেশের জনগণের রয়েছে। বিশ্বের সব মানবিক দেশ ২৫ মার্চের ভয়াবহ ঘটনাকে সাড়ে সাত কোটি মানুষের বিদ্রোহ বলে দেখছেন। যারা সারাজীবন কেবল উপেক্ষা আর বঞ্চনাকে সহ্য করেছে। বিশ্বের প্রায় সব প্রচার মাধ্যম ২৬ মার্চের ভয়াবহতাকে তুলে ধরেছে, যা আপনি অবগত। আমেরিকার বোদ্ধা জনগণও বিষয়টিকে পূর্ব বাংলার মানুষের দাবিগুলোকে উপস্থাপন করেছেন তাদের বিশ্লেষণে। আমেরিকা যদি এ ক্ষেত্রে তার প্রভাব ও কর্তৃত্ব দিয়ে অন্তত শেখ মুজিবকে মুক্তি প্রদানের ব্যবস্থা করত, তাহলে অন্তত যুদ্ধ এড়ানো যেত। মি. প্রেসিডেন্ট, আমি গভীর আন্তরিকতা নিয়ে আপনাকে একটি প্রশ্ন করতে চাই, একজন মানব শেখ মুজিবুর রহমান তাকে মুক্তি দিলে কিংবা তার সঙ্গে গোপনে সমঝোতা করার চেয়ে একটি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়া কি ভয়ানক বিপর্যস্ত অবস্থা সৃষ্টি করেনি?’ শেখ মুজিবের মুক্তির জন্য মহাশক্তিধর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টকে অভিযুক্ত করে লেখা এ ধরনের পত্র দ্বিতীয়টি আছে কি-না সন্দেহ!
৪ নভেম্বর ১৯৭১ সালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আমেরিকার প্রেসিডেন্ট নিক্সনের সঙ্গে বৈঠক করেন। ওই বৈঠকে ইন্দিরা গান্ধী মন্তব্য করেন, এ বিশাল ট্র্যাজেডির বিষয়ে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ নিতান্তই নগণ্য। তিনি নিক্সনকে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্বারোপ করেন। রাজনৈতিক সমাধান বলতে ইন্দিরা গান্ধী বোঝাতে চেয়েছেন, বাংলাদেশের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের মুক্তি। নিক্সন জোর দিয়ে বলেন, অবিলম্বে যুদ্ধবিরতি ও উভয় দেশের সৈন্যদের সীমান্ত থেকে প্রত্যাহার করা। ইন্দিরা গান্ধী পরিষ্কারভাবে বলেন, পূর্ব এবং পশ্চিম পাকিস্তান একত্রে থাকার আর কোনো অবকাশ নেই। ৫ নভেম্বর বৈঠকে নিক্সন পাশের ঘরে বসে কিসিঞ্জারের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ওই ‘বুড়ি ডাইনিকে’ আমরা মাত্রাতিরিক্ত প্রশ্রয় দিয়েছি এবং ইন্দিরা গান্ধীকে তিনি ‘কুক্কুরী’ বলে গালাগাল করতে থাকেন। তিনি ইন্দিরা গান্ধীকে অবহেলা করার জন্য ৪৫ মিনিট পর আলোচনায় বসেন। আলোচনা ভেঙে যায়। নিক্সন ইন্দিরা গান্ধীকে সতর্ক করে বলেন, সামরিক ব্যবস্থা কারও জন্য ভালো হবে না। এর জবাবে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, ‘তিন/চার হাজার মাইল দূর থেকে শুধু বর্ণগৌরবে কোনো দেশ ভারতকে তাদের ইচ্ছামতো আদেশ দেওয়ার ক্ষমতার দিন শেষ হয়ে গেছে।’
যুক্তরাষ্ট্র থেকে ফিরে ইন্দিরা গান্ধী সামরিক বাহিনীকে পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধের সিগন্যাল দেন। সে সময় তিনি বলেন, ‘এখনও সময় আছে শেখ মুজিবকে মুক্তি দিয়ে অবিলম্বে পাকিস্তানকে রাজনৈতিক সমঝোতায় আসতে হবে। আমি বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে নেকড়েদের হাতে ছেড়ে দিতে পারি না।’ ৩ ডিসেম্বর পাকিস্তান ভারত আক্রমণ করলে কলকাতার জনসভা থেকে সংবাদ পেয়ে বিমানে দিল্লি ফেরার পথে ইন্দিরা গান্ধীর মন্তব্য ছিল, ‘The fool has done exactly what one had expected. ইন্দিরা গান্ধী চেয়েছিলেন পাকিস্তান প্রথমে আক্রমণ করুক। পাল্টা আক্রমণ করবে ভারত এবং মিত্রবাহিনী বাংলাদেশে ঢুকে পড়বে। স্বাধীন বাংলাদশের অভ্যুদয় ঘটবে।
বঙ্গবন্ধুর বুঝতে অসুবিধা হয়নি যে, এটা বিচারের নামে প্রহসন চলছে, যা হবে সাজানো মৃত্যুদ-। তিনি নির্বিকার। একের পর এক সাক্ষীরা আসছে। পাকিস্তানের অষন্ডতাকে ধ্বংসের জন্য দায়ী করে সাক্ষ্য দিচ্ছে। প্রসিকিউশন ১০৬ জনের সাক্ষ্য তালিকা ট্রাইব্যুনালে পেশ করেন, কিন্তু তার অর্ধেককে বোর্ডের সামনে উপস্থিত করা হয়নি। যারা কেবল সামরিক অফিসে বা পুলিশের কাছে জবানবন্দি দিয়েছিল তাদেরই হাজির করা হয়। ব্রোহী কোর্টের কাছে আবেদন করেন যারা ক্র্যাকডাউনের আগে ঢাকায় নেগোসিয়েশনে অংশগ্রহণ করেছিলেন কর্নেলিয়াস, পীরজাদা, এমএম আহমদ তাদের হাজির করা হোক। তাদের জেরা করার আবেদন জানান। তখন কোর্ট তার আবেদন নাকচ করে দেন। অর্থাৎ বিচার প্রক্রিয়ার শিকড়ে যাওয়ার ক্ষেত্র বন্ধ করে দেওয়া হয়। সামরিক আদালতে শেখ মুজিবের বিচার ও মৃত্যুদ-ের ব্যবস্থা করার জন্য জেনারেলরা চাপ দিচ্ছে। আমি সম্মত হয়েছি এবং খুব শিগগির বিচার অনুষ্ঠিত হবে। এসবই ছিল ন্যায়বিচার প্রভাবান্বিত করার অপচেষ্টা। এ বিষয়ে আরও কতিপয় বক্তব্য, মন্তব্য উপস্থাপন করা যেতে পারে। এসব প্রচারণা ছাড়াও বন্দি শেখ মুজিবের বিচার প্রভাবান্বিত করার লক্ষ্যে অবিশ্বাস্য মনে হতে পারে এমন কথাও তিনি বলেছেন, যার অর্থ জনগণকে জানানো যে, শেখ মুজিব কী ভয়ঙ্কর দেশদ্রোহী! ইয়াহিয়া খানের যতক্ষণ ইচ্ছা, তাকে ততক্ষণ বাঁচিয়ে রাখা হবে। কোনো খবরের কাগজ, বই বা রেডিও তাকে দেওয়া হয়নি। তার যেটা একমাত্র বিলাসিতা সেই তামাক তাকে দেওয়া হয়েছিল। তিনি দিনের গণনা রাখতেন, পাঠ করতেন কোরআন, তাকিয়ে থাকতেন ক্ষুদ্র একখন্ড আকাশের দিকে এবং নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন কারাগারের অবিচ্ছিন্ন নীরবতার কাছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর পাকিস্তানে ক্ষমতার পটপরিবর্তন ঘটে। ইয়াহিয়া খান বন্দি হন। ভুট্টো ক্ষমতায় আসেন। একদিকে পরাশক্তির চাপ। অন্যদিকে বাংলাদেশে আটক ৯৩ হাজার সৈন্য। এ পরিপ্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়া ব্যতীত পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জুলফিকার আলী ভুট্টোর অন্য কোনো উপায় ছিল না। তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে যে কোনো ধরনের একটি শিথিল সম্পর্ক রাখার পীড়াপীড়ি করলে বঙ্গবন্ধুর পরিষ্কার উত্তর ছিল, দেশের মানুষের কাছে না গিয়ে তিনি কিছুই বলতে পারবেন না। তখন জুলফিকার আলী ভুট্টো বলতে বাধ্য হলেন যে, ‘ইউ আর এ ফ্রি ম্যান।’ এরপর মুজিব প্রেসিডেন্ট ভুট্টোর সঙ্গে কথা বলতে শুরু করলেন। ভুট্টো অনেক রকমের প্রস্তাব দিলেন। কীভাবে একটা কনফেডারেশন করা যায়, কীভাবে একসঙ্গে থাকা যায়, ইত্যাদি। কিন্তু মুজিব কোনো কথাই বললেন না। চুপ করে থেকে শুধু বললেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত আমি আমার প্রিয় সহকর্মীদের সঙ্গে কথা বলতে না পারব, ততক্ষণ আমার পক্ষে কিছুই বলা সম্ভবপর নয়।’ তিনি আরও বললেন, আমার জনগণই আমার জীবন। আমি মৃত্যুকে পরোয়া করি না। আমাকে হত্যা করলে আমার লাশটা বাংলার মাটিতে পাঠিয়ে দেবেন। তারা আমায় বড্ড ভালোবাসে। জীবন-মৃত্যুর মাঝখানে দাঁড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে দেওয়া একটা যৌথ ইশতেহার প্রত্যাখ্যান করলেন। শেখ মুজিব বললেন, ‘আমি কি এখন দেশে যেতে পারি?’ ভুট্টো বললেন, ‘হ্যাঁ, যেতে পারেন। কিন্তু কীভাবে যাবেন? পাকিস্তানের পিআইএ ভারতের ওপর দিয়ে যায় না।’ তখন মুজিব বললেন, ‘সে ক্ষেত্রে আমি লন্ডন হয়ে যাব।’ ৮ জানুয়ারি শেখ মুজিব মুক্তি পেয়ে পিআইএর একটি বিশেষ বিমানে ওঠার আগে জুলফিকার আলী ভুট্টো তার দিকে ৫০ হাজার ডলার হাত খরচের জন্য দিতে চাইলে বঙ্গবন্ধু বললেন, এটা চার্টার বিমানের জন্য আপনি রেখে দেন। তিনি লন্ডনের উদ্দেশে যাত্রা করেন। প্রকৃত অর্থে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব সশরীরে আমাদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন না সত্য, কিন্তু প্রতিটি মুক্তিকামী মানুষের হৃদয়ে তিনি ছিলেন জাগ্রত, রণাঙ্গনে অনুপ্রেরণার উৎসস্থল। তিনি চিরঞ্জীব। তার প্রত্যয়দৃপ্ত অঙ্গীকার, মহৎ আদর্শ ও দর্শনের মৃত্যু নেই। {সংগৃহিত}