বিশুদ্ধ পানি, জ্বালানি ও খাদ্যের অভাব আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে

আকরাম উদ্দিন, সরেজমিন
প্রথম দফা বন্যায় ঘরে কোমর সমান পানি ছিল শহরতলির আপ্তাবনগরের চন্দনা বিবি’র, দ্বিতীয় দফায় আরো বেশি। গত ২৮ জুন ঘরে পানি ওঠলে ২৯ জুন পরিবারের সকলকে নিয়ে ওঠেন শহরের সরকারি কলেজ আশ্রয় কেন্দ্রে। ১০ দিন আশ্রয়কেন্দ্রে কাটিয়ে ৯ জুলাই ফিরেছিলেন বাড়িতে। আবার ১০ জুলাই ঘরে কোমর সমান পানি। আবারও আসলেন আশ্রয়কেন্দ্রে। এখনো (বৃহস্পতিবার) মানবেতরভাবেই আছেন ওখানে। সত্তর বছর বয়সি চন্দনা বিবি (৭০) বললেন, একটা রুমও গাদাগাদি কইরা ৭-৮ টা পরিবার আছি আমরা।’
তিনি জানালেন, একদিকে রান্না বান্নার সমস্যা, অন্যদিকে নেই বিশুদ্ধ পানি। বাথরুমের সমস্যাও প্রকট।
আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা আপ্তাবনগরের বাসিন্দা আমিরজান বিবি, বুরহান মিয়া, রেহেনা বেগম, ইয়ারুন নেছা, সুলতানপুরের সাজুল মিয়াসহ অনেকে জানান, পার্শ্ববর্তী একটি বাড়ি এবং দূরের সদর হাসপাতালের নলকূপ থেকে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয় তাদের। আশ্রয়কেন্দ্রে বাথরুমও পর্যাপ্ত নয়। বিশেষ করে নারী-পুরুষের আলাদা কোন বাথরুম নেই।
আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা রবিউন নেছা জানান, ৮ দিন ধরে পরিবার নিয়ে আশ্রয় কেন্দ্রে অবস্থান করছেন। সব সময় করোনার ভয়ের মধ্যে থাকেন, এছাড়াও রয়েছে রান্না-বান্নার সমস্যা। রান্নার জন্য লাকরি’র সমস্যা আশ্রয়কেন্দ্রে দিন থেকেই ।
আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা ষোলঘরের সুফিয়া খাতুন জানান, পরিবারের ৭ জন নিয়ে এক সপ্তাহ ধরে আশ্রয়
কেন্দ্রে আছেন। ১ দিন চিড়া, মুড়ি, গুড় ও বিস্কুট পেয়েছিলেন। আরেকদিন খাবার দেওয়া হয়। কিন্তু এসব খাবার তার পরিবারের জন্য যথেষ্ট নয়। সত্তর বছর বয়সি সুফিয়া খাতুন বললেন,‘পুয়াইনতের (ছেলেদের) কাম নাই, টেকাও (টাকা) নাই, অখন কেমনে চলতাম।’
আশ্রয়কেন্দ্রে থাকা উছমানগণি জানান, এখানে অনেকেই আছেন, যারা দিনে একবারও খেতে পারছেন না।
শহরতলীর সুরমার উত্তরপাড়ের জগন্নাথপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ৩টি রুমে আশ্রয় নিয়েছেন ১৫ পরিবার। এই আশ্রয় কেন্দ্রে কোনো ত্রাণ পৌঁছেনি বলে জানান বন্যার্তরা। আশ্রয়কেন্দ্রের বাথরুম বন্যার পানিতে ডুবে আছে।
এই আশ্রয় কেন্দ্রে যারা অবস্থান করছেন তারা পেশায় মৎস্যজীবী। দুই দফা বন্যার পুরো সময়টা আশ্রয় কেন্দ্রেই ছিলেন তারা। ভয়াবহ বন্যার পানিতে মাছ ধরতেও যেতে পারছেন না তারা। প্রথম দিকে ধারকর্জ করে চলেছেন। এখন আর কেউ ঋণও দিচ্ছে না। বিপাকে পড়েছেন এরা।
আশ্রয় কেন্দ্রে থাকা বিনন্দ বর্মণ, রাণী বর্মণ, জহুরুন বেগম, জাহানারা বেগম সহ অনেকেই এসব সমস্যার কথা তুলে ধরেন।
মিনতি বর্মণ (৭৫) জানান, আমার পরিবারের সদস্য ৬ জন। প্রথম বন্যা থেকেই এই আশ্রয় কেন্দ্রে আছেন। কোনো সহায়তা পান নি তারা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার ১১ উপজেলার ৩৩৮ আশ্রয়কেন্দ্রেই একই রকমের চিত্র।
জেলা ত্রাণ ও পূনর্বাসন কর্মকর্তা জহিরুল আলম দাবি করেন, আশ্রয়কেন্দ্রে শুকনো খাবার এবং রান্না করা খাবার বিতরণ করা হচ্ছে। মাস্ক বিতরণেরও উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। উপজেলায় পাঠানো চালও আশ্রয়কেন্দ্রের বন্যার্তদের দেওয়া হবে।
সুনামগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নাদের বখ্ত বললেন, প্রথমদিকে পৌরসভার পক্ষ থেকে ত্রাণকেন্দ্রে রান্না করা খাবার দেওয়া হয়েছে। দেওয়া হয়েছে শুকনো খাবার। দুই দফায় ৯১ টনের মতো চাল বন্যার্তদের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ১০ থেকে ১২ হাজার মানুষকে ১০ কেজি করে চাল দেওয়া শুরু হয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে যারা আছেন তাদেরও এই চাল দেওয়া হবে।
জেলা জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবুল কাশেম জানান, পানি বিশুদ্ধকরণের জন্য তারা উপজেলায় উপজেলায় ১০ লাখ টেবলেট পাঠিয়েছেন। বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ৪ লাখ টেবলেট বিতরণ হয়েছে। মোবাইল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টের মাধ্যমে আশ্রয়কেন্দ্র গুলোতে বিশুদ্ধ পানি বিতরণ করা হচ্ছে। ব্লিচিং পাউডার দিয়ে ডুবে যাওয়া টিউবওয়েলগুলোকে পানি নামার পর বিশুদ্ধ করা হচ্ছে।
জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানালেন, জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ আব্দুল আহাদ জানিয়েছেন, তাদের কাছে ৮৬৫ মে.টন চাল, ৪৭ লাখ টাকা, শিশু খাদ্য ও গোখাদ্য এসেছে ও ২৪ শ’ পেকেট শুকনো খাবার এসেছে। তারা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের এসব পৌছে দিয়েছেন। ১০০০ বান্ডিল টিন এসেছে। বন্যার পানি নামলে গৃহ নির্মাণের জন্য বন্যার্ত অস্বচ্ছলদের মধ্যে টিন বিতরণ করবেন তারা। ত্রাণের চাল বা নগদ টাকা দ্রুত পৌঁছে দেবার ব্যবস্থা করতে হবে। হাতে রেখে সময় ক্ষেপন করা চলবে না।