ভাসমান শৌচাগার-জব্দকৃত ড্রামে হচ্ছে শৌচাগার

বিশেষ প্রতিনিধি ও এআর জুয়েল
জেলার বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার ফতেহ্পুর, দক্ষিণ বাদাঘাট ও পলাশ ইউনিয়নের প্রায় ৫০ হাজার মানুষ হাওরাঞ্চলে বসবাস করেন। বছরের ৬ মাস এসব জনবসতির কেবল বসতঘর ছাড়া অন্য সবকিছুই পানিতে নিমজ্জিত থাকে। ঐ সময়ে উন্মুক্ত জলাশয়েই শৌচক্রিয়া সম্পাদন করেন অপেক্ষাকৃত দরিদ্র এলাকার এই বাসিন্দারা। এ কারণে ডায়রিয়া, আমাশয়, কলেরা ব্যাপকভাবে বিস্তারের পাশপাশি ঐ এলাকার বাসিন্দাদের পুষ্টি আহরণের ক্ষমতা হ্রাস পায়। সম্প্রতি উপজেলা প্রশাসনের উদ্যোগে উপজেলার ধোপাজান ও চলতি নদীতে অবৈধ বোমামেশিন ব্যবহারকারীদের কাছ থেকে ভ্রাম্যমাণ আদালত যে ড্রামগুলো জব্দ করেন, এগুলো দিয়েই হাওরপাড়ের এই গ্রামগুলোয় ভাসমান শৌচাগার তৈরি করা হয়েছে এবং বিশেষ প্রক্রিয়ায় এই শৌচাগারের ময়লা দিয়েই জৈবসার তৈরি করে গাছ-গাছালি এবং ফসলি জমিতে দেওয়া ও জৈব সার বিক্রিরও প্রক্রিয়া শুরু করা হয়েছে। হাওরাঞ্চলে এই ধরণের প্রকল্প এটিই প্রথম।
সুনামগঞ্জ জেলা সদর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের উপজেলা বিশ্বম্ভরপুর। বিশ্বম্ভরপুরের ৪ কিলোমিটার দক্ষিণ-পশ্চিমের গ্রাম ঘাগটিয়া। এর একটু দূরেই বাহাদরপুর। ঘাগটিয়া এই এলাকার পুরাতন গ্রাম। গ্রামের পূর্বদিকে করচার হাওর,  
পশ্চিমে রক্তি নদী এবং দক্ষিণে ঘটঘটিয়া নদী ও চাতল হাওর। এই গ্রামের জেলে সম্প্রদায়ের ১২০ পরিবারেরই খোলা শৌচাগার ছিল। পাশের গ্রাম বাহাদরপুরেও অনেক বাড়িতে ছিল খোলা শৌচাগার। কিন্তু গ্রাম দুটিতে এই সময়ে গেলে নতুন এক চিত্র চোখে পড়বে। জেলা প্রশাসন, বিভাগীয় কর্মকর্তা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অবহিত করে ঘাগটিয়া ও বাহাদরপুর গ্রামে ‘নিমজ্জমান হাওরাঞ্চলের অধিবাসীদের জন্য বর্ষাকালীন ভাসমান শৌচাগার-পাইলট প্রকল্প’ নামে ১৩৫ টি শৌচাগার এ মাসের প্রথম সপ্তাহে নির্মাণ করা হয়েছে। ঘাগটিয়া গ্রামের প্রত্যেক বসত ঘরের পেছনেই ৫ টি ড্রাম, বার্মিজ (টিয়া রংয়ের এক ধরণের গাঢ় পলিথিন) টিন ও বাঁশ এবং সামনে ত্রিপাল দিয়ে তৈরি শৌচাগার গ্রামের স্যানিটেশন সমস্যা দূর করে দিয়েছে। একইভাবে বাহাদরপুরেও ১৫ টি শৌচাগার করে দেওয়া হয়েছে। গ্রামবাসী বললেন,‘এই শৌচাগারগুলো আমরা যতœ করেই রাখবো। এগুলো আমাদের উপকারে যে আসবে, সেটি আমরা বুঝতে পেরেছি’।
ঘাগটিয়া গ্রামের নূর হোসেন বলেন, ‘প্রথমে কয়েকটি শৌচাগার ৩ টি ড্রাম দিয়ে করা হয়েছিল, এগুলোতে আরো দুটি করে ড্রাম লাগাতে হবে, না হয় উল্টে যাবার আশংকা আছে। এছাড়া শৌচাগারের সামনে ত্রিপালে একটি লাল কাপড়ের টুকরো থাকতে হবে, শৌচাগারের ভিতরে গেলে এটি নিচের দিকে ঝুলানো থাকবে, না হয় তুলে রাখা হবে। এটি করা হবে শৌচাগারের ভিতরে কেউ আছেন কী না, এটি নিশ্চিত হবার জন্য’।
গ্রামের আসক আলী বলেন,‘এই গ্রামটি অনেক পুরাতন, কিন্তু চতুর্দিকে হাওর ও নদী হওয়ায় কেউ বাড়ির সীমানা বড় করতে পারেনি। এক সময় শৌচাগার দূরের কথা বর্ষায় বাড়ির মাটি আটকানো কষ্টসাধ্য ছিল। এখন কেবল বসতঘরের মাটি আটকে রাখতে একটি উন্নয়ন সংগঠন ইটের দেওয়াল করে দিয়েছে। এবার উপজেলা থেকে শৌচাগার করে দেওয়ায় আমাদের স্যানিটেশনেরও ব্যবস্থা হলো’।
একই গ্রামের মকবুল হোসেন বলেন,‘শৌচাগার নির্মাণ করে দেবার পাশাপাশি জৈব সার তৈরি করার জন্য এখানে রিং দিয়ে ময়লা রাখার স্থান, ময়লা নেবার জন্য পাওয়ার পাম্প মেশিন এবং এসব কাজের জন্য দু’জন শ্রমিক নিয়োগ করা হয়েছে। প্রথমে ময়লা একটি উচু স্থানে রাখা হবে। পরে পানি কমলে নিচে নিয়ে জৈব সার তৈরি করে সেটি নিজেরাও কাজে লাগানো যাবে, বিক্রিও করা যাবে, এটি অবশ্যই ভালো উদ্যোগ’।
গ্রামের সাবেক ইউপি সদস্য নূর জালাল বলেন, ‘এগুলো রক্ষণাবেক্ষণের দায়ও এখনো আমাদেরই। যেহেতু আমরা ব্যবহার করবো, আমরাই রক্ষণাবেক্ষণ করবো’।
স্থানীয় জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক বিশ্বম্ভরপুর প্রেসক্লাবের সভাপতি স্বপন কুমার বর্মণ বলেন,‘এই প্রকল্প সফলতার মুখ দেখলে, হাওরাঞ্চলে ব্যক্তি উদ্যোগে বা উন্নয়নের সংগঠনের উদ্যোগে আরো এ ধরনের কাজ হবে’।
বিশ্বম্ভরপুরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) মুহাম্মদ তালুত এই প্রকল্পটি কোনভাবেই অকার্যকর হবে না দাবি করে বলেন,‘উপজেলা উন্নয়ন সমন্বয় কমিটি দায়িত্বশীলদের অবহিত করে যেভাবে কাজটি শুরু হয়েছে, এটি অবশ্যই সফল হবে, বরঞ্চ যুগান্তর আনা সম্ভব হবে’। বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার বর্তমান ভারপ্রাপ্ত নির্বাহী অফিসার মুহাম্মদ তালুত বলেন,‘এই আইডিয়াটি আমার মাথায় আসে যখন একটি উন্নয়ন সমন্বয় কমিটির সভায় এই অঞ্চলের স্যানিটেশনের দুরাবস্তা নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল, ঐ সভায় জানানো হয়েছিল বর্ষকালীন সময়টুকু সমেত আরো কিছু সময় এই ইউনিয়নগুলো জলমগ্ন থাকে এবং স্যানিটেশন একেবারেই থাকে না। আমি তখন চিন্তা করছিলাম স্যানিটেশনের জন্য বিকল্প কী করা যায়। সে রাতেই আমার মাথায় আসলো- এই অঞ্চলের ধোপাজান এবং চলতি নদীতে অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন করা হয় এক ধরণের বোমা মেশিন নামের যন্ত্র দিয়ে। এই মেশিনগুলো স্থাপন করা হয় ড্রামের উপরে। ভাসমান অবস্থায় কয়েকটি ড্রাম দিয়ে একটি ফ্লাটফরম তৈরি করে, এর উপরে অবৈধ বোমা মেশিন রাখা হয়। আমি যখন এক্সিকিউটিভ ম্যাজিষ্টেট হিসাবে ওখানে অভিযান পরিচালনা করি তখন সেখান থেকে ড্রামগুলো জব্দ করে নিয়ে আসতাম। সেই ড্রামগুলো আমার অফিসের সামনে পরিত্যক্ত অবস্থায় ছিল। সেগুলো দেখে আমার মাথায় আইডিয়া আসে যে, এইগুলো ভাসিয়ে আমরা ভাসমান শৌচাগার করতে পারি। এই অঞ্চল যেহেতু নিচু এবং হাওর বেষ্টিত, বছরের ৬ মাস জলমগ্ন থাকে। সেই সময়টায় স্যানিটেশনের ব্যবস্থা করা অত্যন্ত দুরুহ। আমার মনে হয় স্বল্প খরচে এই আইডিয়াটি অন্যান্য এলাকায়ও বাস্তবায়ন সম্ভব। তাহলে এই এলাকায় স্যানিটেশনের যুগান্তর আনা সম্ভব হবে।