ভ্রমণ- লিংকনের আমেরিকায় কিছু দিন

বজলুল মজিদ চৌধুরী খসরু
(পূর্ব প্রকাশের পর)
ইউনিভারসিটি অব কানেক্টিকাট উইন্ডসর শহর থেকে খুব বেশী দূরে নয়। গাড়ী দিয়ে অনুমান এক ঘন্টা সময় লাগবে। দীপ এরিজোনাতে চলে গেলেও তাদের গাড়ীটা রয়ে গেছে উইন্ডসর শহরে। এই গাড়ী এরিজোনাতে নিতে যে টাকা খরচ হবে তাতে খাজনা থেকে বাজনাই বেশী। তাই গাড়ীটা এখানেই থেকে যাবে। নিশি চলে গেলে গাড়ীটা তানভির নিয়ে যাবে। এখানে গাড়ি না হলে সবাই অচল। তানভিরকে প্রতিদিন  ইউনিভারসিটিতে যেতে হয়। পুরানো লক্কর ঝক্কর গাড়ি নিয়ে সে ইউনিভারসিটিতে যায় তাই দীপদের গাড়িটা সে রেখে দিতে চায়। এজন্য অবশ্য একটা দাম পরিশোধ সে করে নেবে। মজার ব্যপার হলো আমেরিকাতে মানুষ টেলিভিশন দেখা থেকে রেডিও বেশী শুনে। আর রেডিও শুনা হয় গাড়ীতে বসে। এক গবেষণায় দেখা গেছে আমেরিকার মানুষ যত সময় গাড়ী চালায় তত সময় তারা গাড়ীতে রেডিওতে খবরাখবর শুনে, গান শুনে। বাসায় যেয়ে রেস্ট নেওয়ার আগে যতটুকু সময় পাওয়া যায় ততটুকু সময়েই টেলিভিশন দেখে। টেলিভিশন এত শক্তিশালী মাধ্যম হওয়ার পরও ইউরোপ, আমেরিকায় রেডিও বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। আমাদের দেশে এখন আর মানুষ রেডিও শুনে না। কিন্তু উন্নত দেশে রেডিও শুনার মূল কারণই হচ্ছে গাড়ী। আমেরিকার মানুষেরা জীবনের একটি বড় সময় কাটায় গাড়ীতে। আমরা গাড়ীতে বসার পর রেডিও অন করা হল। সেখান থেকে পাওয়া যাচ্ছে, কোন হাইওয়েতে কাজ হচ্ছে, কোন রাস্তায় জ্যাম লেগে আছে ইত্যাদি। তাছাড়া গাড়ীর মধ্যে জিএসপি নামক আরেক ছোট যন্ত্র বসিয়ে দেওয়া হয়। সেই যন্ত্রতে নির্ধারিত জায়গার নাম বসিয়ে দিলেই সেটা দিক নির্দেশনা দিয়ে দেয়। তাই গাড়ি চালকের রাস্তা হারানোর ভয় থাকে না। এই জিএসপিকে ফলো করলেই নির্ধারিত জায়গায় যাওয়া যায়। আশির দশকে জার্মানিতে থাকতে গাড়ী নিয়ে অনেক বেড়াতাম তখন নির্ধারিত জায়গার ম্যাপ সাথে নিতে হত। সেই ম্যাপ দেখে সেই জায়গায় যেতে হত। আজকাল প্রযুক্তি কত এগিয়ে গেছে।
এদেশে বিনা খরচায় প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পড়াশুনা করার সুযোগ আছে তাতে বাংলাদেশী ছেলে মেয়েরা সবাই এই সুযোগটা কাজে লাগিয়ে মাধ্যমিক পর্যন্ত পড়াশুনা করতে পারেন। এখানে পাবলিক স্কুলে পড়াশুনা ফ্রি এবং স্কুলে যাওয়াটা বাধ্যতামূলক। স্কুলে ভর্তি হতে কোন কাগজপত্র তেমন লাগে না। ছেলেটা আমেরিকাতে আইনানুগভাবে বসবাস করছে না বেআইনিভাবে আছে সেটা স্কুল কর্ত্তৃপক্ষ দেখবে না। ভর্তি হলে পরেই শিশুটিকে স্কুলের গাড়ী নির্ধারিত জায়গা থেকে উঠিয়ে নেবে। ইউনিভারসিটিতে পড়তে হলে বৃত্তি পেলে সোনায় সোহাগা কিন্তু বৃত্তি না পেলে নিজে পার্ট টাইম কাজ করে টিউশন ফি সহ আনুষঙ্গিক খরচ চালাতে হয়। আমেরিকায় প্রচুর বিশ্ববিদ্যালয়, টেকনিক্যাল , কমার্শিয়াল, ভকেশনেল কলেজ থাকায় কেউ পড়তে চাইলে তার জন্য রয়েছে অনেক সুযোগ। অনেক বয়ষ্করাও শেষ দিনে এসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করেন। আমার্দে ইচ্ছা ইউনিভারসিটি অব কানেক্টিকাট ভালভাবে দেখা।
আমারা গেলাম ইউনিভারসিটি অব কানেক্টিকাটে। এযে দেখি এলাহি কারবার। এই বিশ্ববিদ্যালয় পুরো দেখতে হলে এক মাসেও শেষ হবে না তাই কিছু নির্দ্দিষ্ট জায়গা দেখতে মনস্থ করলাম। প্রথমেই আমরা গেলাম দীপ নিশি যেখানে থাকত সেই স্টুডেন্টদের জন্য নির্মিত ডরমেটরিতে। এগুলো বানানোই হয়েছে ছাত্র ছাত্রীদের থাকার উপযোগী করে। একটি রুম, একটি ওয়াস রুম আর কমন কিচেন। এই রুমের জন্যই তাদেরকে ছয়শত ডলার মাসিক ভাড়া দিতে হয়।  ডরমেটারি গুলো বানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ব্যবসায়ীরা সব জায়গাই একই রকম। এগুলো বানিয়ে তারা বিদেশী ছাত্রদের কাছ থেকে ভালই কামাই করছে। ডরমেটরি দেখতে গেলে একজনের ঘরে ঢুকতে হয়। দীপ মার্চ মাসে চলে গেলেও নিশি এপ্রিল মাস পর্যন্ত ছিল। আমরা আসার দুদিন আগে রুমটা ছেড়ে রুমুদের একটি বাসায় উঠেছে। এখানে যারা তত্ত্বাবধায়ক আছেন তাদের সাথে নিশির পূর্ব পরিচয়ের সূত্র ধরে আমরা বিল্ডিংটার রুমগুলো দেখতে পারলাম। সেখানেই পরিচয় একটি মেয়ের সাথে।  মেয়েটার নাম শিমু (আসল নামটা নেওয়া হয়নি)। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মেধাবী ছাত্রী। কেমেষ্ট্রিতে অনার্স শেষ করার পরই ২০১৩ সালে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচডি করার জন্য স্কলারশিপ পেয়ে যায়। তাই মাস্টার্স না করেই চলে এসেছে। কথা বার্তার মাঝে তার রান্না খাওয়ার জন্য পরদিন দুপুরে দাওয়াত দিল। আমরা পরদিন তার বাসায় এসে খাওয়া দাওয়ার ফাঁকে গল্প গুজব করব বলে ঠিক করেছিলাম কিন্তু রাতেই খবর পেলাম শিমুর আম্মা বাংলাদেশে মারা গেছেন। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে সে আমিরাত এয়ারলাইন্সের একটা টিকেট জোগাড় করে রাতেই নিউ ইয়র্ক চলে গেছে। ইউনিভারসিটির কাফেটারিয়াতে গিয়ে দেখি এটা আরেক ফুটবল মাঠ। এ পাশ থেকে ও পাশ একদম দেখাই যায় না। টেবিল ঘিরে  যার যার মত ছাত্র ছাত্রীরা বসে আছেন। কোন ওয়েটার বা কর্মচারী নেই। খাবার আনার জন্য নিজেদের যেতে হবে। আবার খাওরার পরে ময়লা নিজ হাতে ফেলে আনুষাঙ্গিক জিনিষপত্র দিয়ে আসতে হবে। আমরাও একটা টেবিলকে সামনে রেখে বসলাম। সাথে কিন্তু কোন চেয়ার নেই। আমাদের টুলের মত কিছু বসার উপকরণ থাকলেও সেগুলো মোটেই আরামদায়ক নয়। এতক্ষণে বুঝলাম এগুলো রাখাই হয়েছে যাতে কেউ খামোখা বসে না থাকে। তাই কারো ইচ্ছাই হয় না বেশী সময় থাকতে। নিশি খাবার আনতে লাইন ধরেছে। আমার জন্য চিকেন সালাদ আনতে বলেছি। ঘাসের মত সব রকমের পাতা আর মাঝে মাঝে মোরগের ছোট ছোট টুকরা। আমার কাছে বেশ ভালই লাগে খাবারটা। আমাদেরকে দেখে একটি ছেলে এগিয়ে আসল। মনে হল বাংলাদেশী। নিজেই পরিচয় দিয়ে বলল আমি এহসান। আপনারাতো দীপের আত্মীয়। আমাকে বলল আপনাকেতো দীপের মত লাগছে। আমি বললাম আমিতো দীপের বাবা তাই দীপের মতই লাগার কথা। ছেলেটা বেশ বাকপটু। নিজেই বলে চলছে। বুয়েটে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং করে এখানে পিএইচডি করতে এসেছি।  (চলবে)