এনাম আহমেদ
৬ষ্ঠ পর্ব
মস্কো বিমান বন্দরে পৌঁছে আমরা সবাই এক জায়গায় সমবেত হলাম। এই ফ্লাইটে বাংলাদেশ থেকে আমরা ২২জন এসেছি। এখানে দলনেতা হাফিজ আদনান রিয়াজ আমাদেরকে ব্রীফ করেন। তিনি জানান, এটি পৃথিবীর বৃহত্তম দেশের বৃহত্তম অশিক্ষিত বিমানবন্দর! এরা এক বর্ণ ইংরেজি বলবেনা, বুঝবেও না। আমাদের সবাইকে আলাদা আলাদা রূমে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। আমরা কেন রাশিয়ায় এসেছি? কতদিন থাকব? কবে ফিরব? এসব নানা প্রশ্নের উত্তরে তারা যদি সন্তুষ্ট হন, তবেই আমাদের রাশিয়া ঢুকতে দিবে। নয়তো দিবে না। অতীতে নাকি এমন হয়েছে, রাশিয়ার ভিসা থাকার পরও ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা সন্তুষ্ট না হওয়ায় অনেককে রাশিয়ায় ঢুকতে দেয়নি। সুতরাং সবাইকে ঐভাবে প্রস্তুুত হতে বলেন তিনি। আমরা আবারও আকাশ থেকে পড়লাম! এবার বিমানে না, সরাসরি! পিনাক বলল, আপনি বিমানে এ ব্যাপারটি জানালে আমরা সেখানে বসে এ বিষয়গুলো মুখস্ত করে ফেলতে পারতাম। এখন এ অল্প সময়ে আমরা কিভাবে প্রস্তুত হব? মস্কো পৌঁছেও রাশিয়া আসা- না আসার জোয়ার- ভাটা চলতে থাকবে, এটি কে ভেবেছিল? রাশিয়া অতি ঠান্ডা দেশ। বিমানবন্দরের বাইরে বের হওয়া ঠিক হবে না, এই বলে নিজেকে সান্তনা দিলাম। পরিবেশ হালকা করার জন্য হাফিজ চৌধুরী বলল, এতো চিন্তার কী? রাশিয়া তো আমরা এসেই গেছি। এখন ফিরে গেলে কোন দুঃখবোধ তো থাকার কথা না। এরচেয়ে আসেন আমরা এ সময়টাকে উপভোগ করি। সবাই মিলে স্মৃতি হিসেবে কিছু গ্রুপ ছবি তুলে রাখি। তার কথায় আমরা সংবিৎ ফিরে পেলাম। আবার সবার মধ্যে প্রাণচাঞ্চল্য ফিরে এলো। এখানে অন্তত হাজার খানেক ছবি উঠা হল। রাশিয়ান প্রমাণ বলে কথা! ততক্ষণে আমাদের সাথে আসা অন্যান্য যাত্রীরা হাওয়া। আমরা সবাই হাঁটতে থাকলাম। আসলেই অনেক বড় বিমানবন্দর। ইমিগ্রেশন কাউন্টারের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। হাঁটছি তো হাঁটছি। অবশেষে দেখা মিলল রাশানদের। দশটি কাউন্টারের মধ্যে চারটিতে চারজন কর্মকর্তা বসা। বাকী গুলো বন্ধ। এদিকে লাইনে সামান্য কিছু মানুষ দাঁড়িয়ে। আমরা লাইনে না দাঁড়িয়ে নিরাপদ দূরত্বে জটলা পাকিয়ে পরিস্থিতি বুঝার চেষ্টা করলাম। এভাবে চলল কিছু সময়। একপর্যায় একটি কাউন্টার পুরো ফাঁকা হয়ে গেল। এখন আমাদের উপায়? হঠাৎ জালাল ভাই পাসপোর্ট হাতে নিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে গেলেন। ফুটবল খেলায় ট্রাইব্রেকারের সময় একজন শট নিতে গেলে বাকী খেলোয়াররা যেভাবে পরষ্পরকে আকড়ে ধরে ফলাফলের অপেক্ষা করতে থাকে, আমরা সেভাবে নিশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে থাকলাম। অদ্ভুত ব্যাপার, ২ মিনিটের মধ্যে তিনি ভেতরে ঢুকার অনুমতি পেয়ে গেলেন। তিনি ভেতরে দাঁড়িয়ে সহাস্যে আমাদের সাহস দিলেন। আমরা হুড়মুড় করে গিয়ে ঐ কাউন্টারের সামনে লাইন দিলাম। অন্য কাউন্টার খালি হলেও সেদিকে আমরা গেলাম না। ইমিগ্রেশন ভীতির কিছু যৌক্তিক কারণও আমাদের আছে। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রণালয় থেকে আমাদের নামে যে আমন্ত্রণ পত্র এসেছিল, সে পত্রের তথ্যের সাথে আমাদের পাসপোর্টের তথ্যের অনেক গড়মিল। আমন্ত্রণ পত্র ও পাসপোর্ট মেলালে আমরা অনেকে ধরা খাব।
যাই হোক এক পর্যায়ে আমার পালা এল। কর্মকর্তার কাছে পাসপোর্ট জমা দিয়ে শুকনো মুখে দাঁড়িয়ে রইলাম। তিনি ল্যাপটপে তথ্য যাচাই করে পাসপোর্টে সিল মেরে অন্য একটি কাগজসহ আমার হাতে দিয়ে দিলেন। মুখে উচ্চারণ করলেন
এক অদ্ভূত শব্দ, সম্ভবত রাশান ভাষায়। বিচলিত হলাম! তৎক্ষণাৎ স্বয়ংক্রিয় ভাবে গেট খোলে গেল। বুঝলাম রাশিয়ায় ঢুকার অনুমতি। উনাকে খাটি বাংলায় ধন্যবাদ দিয়ে লাফ দিয়ে সত্যিকারের রাশিয়ায় প্রবেশ করলাম। বহু আত্মত্যাগ, তিতিক্ষা, লড়াই- সংগ্রাম, বিপ্লবের পর অবশেষে…..। ভেতরে জালাল ভাই উৎকন্ঠিত অপেক্ষায়। তিনি আমাদের সত্যিকার রাশিয়ায় স্বাগত জানালেন। যেন, দেখা হল বনের পাখির সাথে খাঁচার পাখির! একে একে সবাই ভেতরে প্রবেশ করল। এতো সহজে রাশিয়ায় ঢুকতে পেরে আমরা হতবাক। ঢাকা বিমান বন্দরে বরং আমরা হেনস্থা হয়েছি। জালাল ভাই বিষয়টি ব্যাখ্যা করে বললেন, রাশিয়া আমাদের যে ভিসা দিয়েছে সেটির ক্যাটাগরি হচ্ছে গ্যাটিস। এটি রাষ্ট্রিয় সম্মানসূচক ভিসা। এজন্য ইমিগ্রেশন আমাদের কোন প্রশ্ন,এমনকি নামও জিজ্ঞেস করেনি। আনন্দঘন পরিবেশে যখন সবাই মাতোয়ারা, দ্রুত লাগেজ সংগ্রহের জন্য জালাল ভাই সবাইকে তাড়া দিলেন। কারণ এই বিকেলেই সবার ঐতিহাসিক রেড স্কোয়ারে যাবার কথা। লাগেজের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। বেল্টের কাছে গিয়ে দেখা গেল অসংখ্য লাগেজ ঘুরছে। এক পর্যায়ে আমার দুটি লাগেজ দৃশ্যমান হল। বিদেশ বিভূইয়ে নিজের লাগেজ দেখতে পেয়ে নিকটাত্মীয় দেখার মতো প্রশান্তি পেলাম। আমার দুর্বল লাগেজটি অক্ষত থাকায় সর্বোচ্চ আদালতের দুজন আইনজীবী অ্যাড কাউসার ও অ্যাড সেজুলের প্রতি কৃতজ্ঞতা অনুভব করলাম। তারা এটিকে চমৎকার ভাবে প্যাক করে দিয়েছিল। কাছাকাছি স্থানে সুমনকে মাথায় হাত রেখে বসে থাকতে দেখা গেল। সাথে তার ৩/৪ জন অনুসারি। তাদেরও মাথায় হাত! জানা গেল সুমন রাশিয়া আসার ঠিক আগে আগে নতুন লাগেজ কিনে তাতে কাপড় ভরে চলে এসেছে। লাগেজটি ভাল ভাবে খেয়াল করেনি। এখন এতো লাগেজের ভীড়ে নিজের লাগেজের রং, আকৃতি, প্রকৃতি কিছুই মনে করতে পারছে না। রাশিয়ায় ঢুকে মনে করেছিলাম সব বিপদ কেটে গেছে। দেখা গেল বিপদ কাটেনি, সুমনের নেতৃত্বে বিপদ নব নব রূপে আর্বিভূত হচ্ছে। উপায়ান্তর না পেয়ে আমিও মাথায় হাত দিয়ে সুমনের সংহতি মানববন্ধনে বসে পড়লাম। দেরি হয়ে যাচ্ছে দেখে চলনসই আনুমানিক একটি লাগেজ সুমনকে দিয়ে বিমানবন্দরের লাউঞ্জে চলে আসলাম। সেখানে বিশ্ব যুব উৎসবের একদল স্বেচ্ছাসেবক আমাদের স্বাগত জানায়। বাইরে বের হয়েই দুর্দান্ত ঠান্ডার মুখোমুখি হলাম। আমাদের দলনেতা আগে থেকেই মস্কোর একজন বাঙালির সাথে যোগাযোগ করে সার্বিক ব্যবস্থা রাখার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। তিনি আমাদের জন্য বাস নিয়ে এলেন। ঐতিহ্যবাহি ইউরোপিয়ান বাস। বাসের নিচের অংশে আমাদের ৪০টি লাগেজ জায়গা হয়ে গেল। বাসে উঠেই আমাদের মাথা ঠান্ডা হলেও পেট গরম হয়ে গেল। গাইড বাস থামিয়ে খাওয়ানোর প্রতিশ্রুতি দিলে গাড়ি চলতে শুরু করল। মস্কো দেখার চেষ্টা করলাম। নয়ন জুড়ানো অরণ্য। হালকা হলুদ রঙের পাতা। মাঝে মাঝে কিছু গাছের পাতা লালচে। সুপরিকল্পিত বনায়ন যাকে বলে। কিছুক্ষণ পর পর বাস জ্যামে আটকাচ্ছে। রাস্তায় চলছে বেশির ভাগই চার সিটের গাড়ি। রাস্তা গুলো ‘ডুয়েল ক্যারেজ ওয়ে’। রাস্তার পরে কিছু জায়গা ফাঁকা, তারপর প্রশস্ত ফুটপাত। আবার ফাঁকা জায়গা, তারপর ঘরবাড়ি,অফিস পাড়া। ইউরোপের অন্যান্য শহরের চেয়েও মস্কোতে ফাঁকা জায়গা বেশি। ফুটপাতে চলাচলকারী লোক সংখ্যা হাতে গুণা। রাশিয়ান মানুষজন তুলনামূলক লম্বা ও স্লিম বলে মনে হল। একটি সরু নদী এঁকে বেঁকে মস্কোর উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সুদৃশ্য ব্রীজ দিয়ে কয়েকবার আমরা এই নদী অতিক্রম করে গেলাম। বাসটি এসে থামল ‘ম্যাকডোনাল্ডস’ এর পাশে সুদৃশ্য পার্কে। তার উল্টো দিকে পিউপিলস ফ্রেন্ডশীপ ইউনিভার্সিটি। এখানে বাংলাদেশের অনেক শিক্ষার্থী পড়াশুনা করে বলে আমরা খবর পেয়েছি। পার্কে নেমে আমরা কিছু ছবি উঠালাম। ‘ম্যাকডোনাল্ডস’ থেকে আমরা সময় কাটানোর জন্য বার্গার ও ড্রিংকস পার্শেল নিয়ে নিলাম। বাস আবারও চলতে শুরু করলো। রাস্তার দুই প¦ার্শ্বে ঐতিহাসিক ও সুদৃশ্য সব স্থাপনা। মস্কো শহরে ৩০ বছর যাবৎ অবস্থান করা একজন গাইড সাথে থাকায় আমাদের খুব সুবিধা হল। আমাদের দেখালেন ঐতিহাসিক অক্টোবর চত্বর, বাংলাদেশের বাম রাজনীতির কিংবদন্তী পুরুষ, সিপিবি’র সাধারণ সম্পাদক কমরেড মুহাম্মদ ফরহাদ যে হসপিটালে মারা যান, সেটি আমরা দেখলাম। বর্তমানে এই হাসপাতালকে তারা আবাসিক হোটেলে রূপান্তরিত করেছে। গাইড আমাদের দেখালেন রাশিয়ার বিভিন্ন দেশের সরকার প্রধান সফরে আসলে যে হোটেলে অবস্থান করেন সেটি। পৃথিবীর উঁচুতম বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ৪৩ তলা বিশিষ্ট এবং সর্বমোট উচ্চতা প্রায় ৮৫০ ফুট। প্রায় সোয়া এক ঘন্টায় মস্কোর নয়নাভিরাম দৃশ্যবলী দেখে দেখে আমরা পৌঁছে গেলাম বহু কাক্সিক্ষত রেড স্কোয়ারের পাশে। বিশাল পার্কিং এ এসে আমাদের বাসটি থামল। পার্কিং এ পর্যটকদের অসংখ্য গাড়ি। আমরা বাস থেকে নামলাম। পাশেই বয়ে চলেছে মস্কোভা নদী। সময়টা বড় অদ্ভূত। শেষ বিকেলে সূর্যের রঙিন আলো এসে পড়েছে রেড স্কোয়ার ও এর সংলগ্ন ইতিহাস খ্যাত ক্রেমলিনে। আমরা ফিরে গেলাম ১০০ বছর আগে। ১৯১৭ সাল। রেড স্কোয়ারে আসছেন লেলিন। এইতো……………। চলবে


