রোযার জরুরী মাসাঈল

মাহবুবুল হক সালমান
রোজার হাকীকত
অনেক এমন রয়েছে যারা রোজার হাকীকত সম্পর্কে বেখবর। তারা রোজাকে কেবলই খাবার ও পানীয় থেকে বিরত থাকার মধ্যে সীমিত করে দিয়েছে। তাদের রোজা মিথ্যাচারিতায় জবান দরাজ করতে  বারণ করে না। চোখের ও কানের লাগাম তারা উন্মুক্ত করে দেয়। তারা গুনাহ ও পাপে নিপতিত হতে সামান্যও উৎকণ্ঠিত হয় না। অথচ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন: যে ব্যক্তি মিথ্যা কথা, সে অনুযায়ী কাজ এবং  মূর্খতা পরিত্যাগ করল  না, তার খাদ্য ও পানীয় থেকে বিরত থাকায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।
কবি সত্যই বলেছেন:
রক্ষিত যদি না হয় কর্ণ
দৃষ্টিতে  না থাকে বাধা
তবে বুঝে নিও
আমার রোজা কেবলই তৃষ্ণা ও পিপাসা।
যদি বলি আমি আজ রোজা,
মনে করিও   আমি আদৌ রোজাদার নই।
রোযার নিয়্যাত: নিয়্যাত বলা হয় অন্তরের ইচ্ছা ও আগ্রহকে। এটি মনে-মনে হোক বা মুখে উচ্চারণে হোক, থাকতে হবে। রোজার জন্য নিয়্যাত শর্ত। সুতরাং কেউ রোযার নিয়্যাত ছাড়া সারাদিন পানাহার থেকে বিরত থাকলেও তা রোযা বলে গণ্য হবেনা। রমযানের রোযার নিয়্যাত রাতে করা উত্তম,এসময় রাতে নিয়্যাত না কওে থাকলে, সুর্য ঢলে যাওয়ার দেড় ঘন্টার পূর্ব পর্যন্ত নিয়্যাত করতে পারবে।
সেহরী
রোযাদার ব্যক্তির জন্য রাতের শেষ ভাগে সুবহে সাদেকের পূর্বে সেহরী খাওয়া বিশেষ বরকত ও সুন্নাত। রাতের প্রথম অর্ধেক চলে যাওয়ার পর পরই যে কোনো সময় পানাহার করলে তা সেহরী খাওয়ার সুন্নাত আদায় হয়ে যাবে। তবে রাতের শেষ ভাগে তা খাওয়া উত্তম। সময় হওয়ার পুর্বে  আযান দিয়ে ফেললে সুবহে সাদেক হওয়া পর্যন্ত সেহরী খেতে কোনো অসুবিধা নাই। রোযার নিয়্যাত মনে মনে করা যথেষ্ট। তবে মুখে এ বাক্যটি বলা উত্তম“বিসাওমি গাদান নাওয়াইতু মিন শাহরি রমাযান।
ইফতার
সূর্য ডুবে যাওয়ার পুর্ণ বিশ্বাস হলে ইফতার দেরী করা মাকরুহ। আকাশে মেঘ থাকার করণে সময়ের ব্যাপারে সন্দিহান হলে কিছু সময় দেরী করা ভালো। এ ক্ষেত্রে সূর্য অস্ত যাওয়ার নির্দিষ্ট সময় থেকে তিন মিনিট সতর্কতা হিসাবে দেরী করা সব চেয়ে উত্তম।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের কেউ যখন ইফতার করবে সে যেন খেজুর দ্বারা ইফতার করে । কেননা এটি খুব বরকতময়। খেজুর একটি পূর্ণ সুন্নাত। খেজুর ছাড়া অন্য কোনো হালাল খাবার দিয়েও  ইফতার করা যায়।
ইফতারের দোয়া “আল্লহুম্মা লাকা সুমতু ওয়ালা রিযকিকা আফতারতু”।
যে সকল কারণে রোযা ভঙ্গ হয়।
১. নাকে ও কানে ঔষধ প্রবেশ করালে। ২. ইচ্ছাকৃত মুখ ভর্তি বমি করলে। ৩. কুলি করার সময় গলার ভিতর পানি চলে গেলে। ৪. নারী স্পর্শ বা অন্য কোনো কারণে বীর্য নির্গত হলে। ৫. খাদ্য ও খাদ্য হিসেবে গণ্য নয় এমন বস্তু গিলে ফেললে। ৬.আগর বাতি বা এ জাতীয় বস্তুর ধোঁয়া ইচ্ছাকৃত ভাবে নাকে বা গলায় প্রবেশ করালে। ৭. বিড়ি সিগারেট পান করলে  ৮. ভুলে কিছু খাওয়ার পর রোযা ভেঙ্গে গেছে মনে করে ইচ্ছাকৃত ভাবে পূণরায় খেলে।  ৯. রাত বাকী আছে মনে করে সুবহে সাদেকের পর সেহরী খেলে। ১০. দিন বাকী থাকতে সূর্য প্রায় ডুবে গেছে মনে করে ইফতার করলে।
উপরে বর্ণিত কাজগুলির কারণে রোযা ভঙ্গ হয়ে গেলে শুধু কাযা ওয়াজিব কাফ্ফারা নয়।
১১. ইচ্ছাকৃতভাবে স্ত্রী সহবাস কিংবা পানাহার করলে কাযা ও কাফ্ফারা উভয়টি ওয়াজিব।
কাফ্ফারা কী?
কাফ্ফারা হলো একটি গোলাম আযাদ করা অথবা ৬০টি ধারাবাহিকভাবে এক সাথে রাখা। এ ধারাবাহিকতায় একটি রোযা ভেঙ্গে গেলে পুণরায় নতুনভাবে ৬০টি রোযা রাখতে হবে।
রোযা রাখার শক্তি না থাকলে ষাট জন মিসকীনকে দু’বেলা পেট ভরে খাওয়াতে হবে। বর্তমানে গোলাম দাসীর প্রচলন না থাকায় রোযা রাখা বা মিসকীন খাওয়ানোর যে কোনা একটি নিয়ম প্রযোজ্য।
রোযা মাকরুহ হওয়ার কারণসমূহ
১.কোনা জিনিস চিবানো বা স্বাদ গ্রহন করে ফেলে দেওয়া। টুথপেস্ট,মাজন ও কয়লা ইত্যাদি দিয়ে দাঁতপরিস্কার করা। তবে এসবের স্বাদ গলায় প্রবেশ করলে রোযা ভেঙ্গে যাবে। (আহসানুল ফতোয়া-৪/৪২৯। ২. গোসল ফরয হওয়ার পর সারা দিন এ অবস্থায় থাকা। ৩. সিঙ্গা লাগানো অথবা কোনো রুগীকে রক্ত দান করা। ৪. রোযার দিনে গীবত বা পরনিন্দা চর্চা করা অত্যন্ত গোনাহের কাজ। ৫. ঝগড়া বা কোনা কারণে মানুষ কিংবা প্রাণী বা কোনো জড়পদার্থকে গালী দেওয়া।৬. রোযাদার নারীর জন্য ঠোটে রঙ্গিন জিনিষ লাগানো জায়েয হলেও মূখের ভিতরে প্রবেশের আশঙ্কা থাকলে তা মাকরুহ।(আহসানুল ফাতওয়া-৪/৪২৪। ৭. শারিরীকভাবে অত্যন্ত দূর্বল এবং রোযা রাখার শক্তি হারানোর প্রবল আশঙ্কা অবস্থায় ইনজেকশনের মাধ্যমে রক্ত বের করা। ৮. প্রয়োজন ছাড়া দাঁত উঠানো বা দাঁতে ওষধ ব্যবহার করা। ৯.রক্ত আথবা ওষধ পেঠে পরলে বা থুথুর চেয়ে তা বেশী বা সমপরিমান হলে রক্ত এবং ওষধের সমপরিমান স্বাদ অনুভূত হলে।
রোযা ভঙ্গ বা মাকরুহ না হওয়ার কারণসমূহ
১. মিসওয়াক কর। ২. মাথায় বা চুলে তেল দেওয়া। ৩. চোখে ওষধ বা সুরমা ব্যবহার করা। ৪. গরম বা পিপাসার কারণে গোসল করা। ৫. খুশবু ব্যবহার বা তার ঘ্রাণ গ্রহন করা। ৬. ইনজেকশন বা টিকা দেওয়া। ৭. ভুলে পানাহার করা অথবা অনিচ্ছায় গলায় দুলা বালি বা মাছি ঢুকে যাওয়া। ৮. কানে পানি প্রবেশ করা। ৯. এমনিতে ভবি হওয়া। ১০. দাঁতের গোড়া থেকে রক্ত বের হওয়া। তবে তা গলায় প্রবেশ করলে রোযা ভঙ্গ হয়ে যাবে।
যে সব কারণে রোযা না রাখার অনুমতি রয়েছে
১.কোনো অসুখের করনে রোযা রাখার শক্তি হারিয়ে ফেললে অথবা রোগ বৃদ্ধির আশঙ্কা হলে।  তবে পরে এ রোযার কাযা করতে হবে।২.গর্ভবতী নারীর সন্তান কিংবা নিজের প্রাণনাশের ভয় হলে।৩.অপরের সন্তানকে দুধ পান করার কারণে, ধাত্রী নারী নিজের নিজের কিংবা সন্তানের কষ্ট হলে। ৪.কোনো ব্যক্তি শরয়ী মুসাফির তথা নিজ বাড়ি থেকে শরয়ী ৪৮ মাইল দুরে সফর করার ইচ্ছা করলে। ৫.সফর অবস্থায় কষ্ট না হলে রোযা রাখা উত্তম, আর কষ্ট হলে না রাখা উত্তম। ৬. রোযা রাখা অবস্থায় সফর শুরু করলে তা পুরা করা জরূরী। আর সফর অবস্থায় রোযা না রেখে বাড়িতে ফিরে আসার পর দিনের কিছু অংশ বাকী থাকলে,পানহার থেকে বিরত থাকবে। কোনো ব্যক্তি পানহার না করা অবস্থায় সূর্য ঢলে পরার দেড় ঘন্টা পূর্বে নিজ বাড়িতে ফিরে এলে নিয়্যাত করে রোযা রাখতে হবে। ৭.কেউ হত্যার হুমকি দিয়ে রোযা ভাঙ্গতে বাধ্য করলে, রোযা ভেঙ্গে ফেলবে এবং পরে তার কাযা করতে হবে। ৮.কোনো রোগীর ক্ষুধা বা তৃষ্ণা এমন পর্যায়ে বৃদ্ধি পায় যে, কোনো মুসলমান দ্বীনদার ডাক্তার রোযা ভঙ্গ না করলে রোগীর মৃত্যুর আশঙ্কা করেন। এ অবস্থায় রোযা ভেঙ্গে ফেলা ওয়াজিব। তবে পরে কাযা করে নিতে হবে। ৯.হায়েয বা নিফাস অবস্থায় রোযা রাখা জায়েয নয় বরং তা অন্য সময় আদায় করবে। উল্লেখ্য যাদের রোযা ভঙ্গের অনুমতি দেওয়া হয়েছে তাদের জন্যে জনসম্মুখে পানাহার না কর্ইা বাঞ্চনীয়।
পবিত্র রমজান মাসে আমাদের করণীয়
যেহেতু পবিত্র মাহে রমজান মাস মুসলিত মিল্লাতের একটি জন্য আমল বৃদ্ধির অন্যতম একটি মাস। এ মাসে একটি নফল ইবাদতের মুল্য ফরজ ইবাদতের সমান। একটি ফরজ নেকী আদায় করলে ৭০গুন থেকে ৭০ হাজার গুন পরিমান নেকী অর্জনের মাস। আমরা মুসলমান হিসেবে পবিত্র মাহে রমজান মাসের পবিত্রতা রক্ষা করতে হবে। দিনের বেলায় কোনবস্থায় খাবারের হোটেল খোলা রাখা যাবেনা । অশ্লীল কাজ করা যাবেনা । রোজার মাসে যদি আমরা গোনাহ মাফ নিতে না পারি তাহলে আমরা ধ্বংস হয়ে যাব। যারা পবিত্র রমজান মাসের রোজা পেয়েও নিজের গুণাহ মাফ নিতে পারিনি তাকে প্রিয় নবী হযরত মোহাম্মদ (সাঃ) তার ধ্বংষ কামনা করেছে। আমরা যেন যথাযথভাবে পবিত্র মাহে রমজানের রোজা আদায় ও তার সকল কার্যাবলী ঠিকভাবে আদায় করতে পারি আল্লাহ যেন আমাদের তাওফিক দান করে( আমিন)
লেখক : সম্পাদক, মাসিক নবীনকুঁড়ি
মোবাইল : ০১৭১৫-২৭৪৩৫৭