শিক্ষার স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নে ব্যাপক উদ্যোগ প্রযোজন

চলতি বছর মাধ্যমিক উত্তীর্ণদের একটি বড় সংখ্যক শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তির জন্য আবেদনই করেননি বলে ঢাকা শিক্ষা বোর্ড সূত্রে জানা গেছে। গতকাল গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের জ্যেষ্ঠ এনালিস্ট মঞ্জুরুল কবীর শুক্রবার সকাল সাড়ে ১০ টা পর্যন্ত প্রায় পৌনে দুই লাখ শিক্ষার্থীর আবেদন না করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। এবছর মাধ্যমিক ও সমমান পরীক্ষা পাস করেছেন ১৪ লাখ ৭৩ হাজার ৫৯৪ শিক্ষার্থী। প্রায় পৌনে দুই লাখ শিক্ষার্থীর কলেজে ভর্তির আবেদন না করার বিষয়টি উদ্বেগজনক। এত বিপুল সংখ্যক শিক্ষার্থী যদি মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়ে তাহলে বিষয়টি দুশ্চিন্তার বৈকি। এই ঝরে পড়ার বিষয়টি আমাদের প্রত্যাশিত শিক্ষাচিত্রের জাতীয় আকাক্সক্ষার সাথে বেমানান। তাই বিষয়টি নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিন্তাভাবনা করা উচিত।
প্রাথমিকে শতভাগ শিশুর স্কুলে ভর্তি হওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করার পর প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায়ে ঝরে পড়া বন্ধ করা ছিল একটি কঠিন চ্যালেঞ্জ। অন্তত উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত সকল শিক্ষার্থী যাতে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারে সেজন্য সরকার শিক্ষা খাতে নানা ধরনের সহযোগিতা ও প্রণোদনা জুগিয়ে আসছেন। মাধ্যমিক পর্যায় পর্যন্ত বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, উপবৃত্তি বিতরণ, কলেজ পর্যায় পর্যন্ত মেয়েদের অবৈতনিক শিক্ষা, শ্রেণিকক্ষ, শিক্ষক ও পাঠদান পদ্ধতির সংখ্যা বাড়ানোসহ গুণগত উৎকর্ষতা সাধন এর অন্যতম  উদাহরণ। কিন্তু তদসত্বেও প্রাথমিকে যেমন ঝরে পড়া রোধ করা যায়নি তেমনি মাধ্যমিকে এসেও ঝরে পড়ার ¯্রােত আটকানো যাচ্ছে না। সহ¯্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষমাত্রা অর্জিত হওয়ার পর এখন দেশে স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নের শ্লোগান সামনে আনা হয়েছে। স্থায়ীত্বশীল উন্নয়নের শর্ত হলো যে শিশুটি প্রাথমিকে প্রথম শ্রেণিতে ভর্তি হবে ১২ বছরের মাথায় এসে তার উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার নিশ্চয়তা বিধান। এমন একটি কঠিন লক্ষমাত্রা অর্জন সত্যিকার অর্থেই কঠিন। তবে দেশকে উন্নত রাষ্ট্রে পরিণত করতে হলে এই কঠিন কাজটিই করে দেখাতে হবে।
অনলাইনে ভর্তি কার্যক্রম শুরু হওয়ার  আগে মাধ্যমিক উত্তীর্ণ কত শিক্ষার্থী কলেজে যেতে পারছেন না তার সঠিক তথ্য পাওয়া যেত না। অনলাইন ভর্তির আবেদন চালু হওয়ায় এখন সহজেই হিসাবটি পাওয়া যাচ্ছে। যেকোন কাজে সফলতা পাওয়ার পূর্বশর্ত হলো সঠিক তথ্য প্রাপ্তির নিশ্চয়তা। এবার যখন জানা গেল যে পৌনে দুই লাখ শিক্ষার্থী কলেজে ভর্তি হচ্ছেন না তখন এর সমাধানে কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের পন্থা চিন্তা-ভাবনার অবকাশ তৈরি হলো। আমাদের মনে হয়, সামাজিক সম্পদ বৈষম্য ও শিক্ষায় ব্যয়াধিক্য এই ঝরে পড়ার পিছনে একটি বড় কারণ হিসাবে কাজ করছে। সরকারের শিক্ষাক্ষেত্রে নানামুখী সহযোগিতার গা ধরে আসা শিক্ষার ব্যয়াধিক্য একটি চরম বৈসাদৃশ্য ও হতাশাজনক চিত্র। এখন সরকার পাঠ্যবই বিনামূল্যে দিচ্ছেন। কিন্তু গ্রামার ও অনুশীলন গ্রন্থের নামে এক গাদা বই কিনতে অভিভাবকদের খরচ করতে হয় কাড়ি কাড়িা টাকা। স্কুল-কলেজে ন্যুনতম লেখাপড়া করানো হয় না। শিক্ষার্থীদের পড়তে হয় একাধিক প্রাইভেট শিক্ষকের কাছে। এত ব্যয় বহন করার ক্ষমতা নেই দেশের প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের। তাই শিক্ষার ব্যয় কমানো দরকার সবার আগে। শিক্ষিত যুবক যুবতিদের শিক্ষা জীবন সমাপ্তির পর কাজের নিশ্চয়তা দিতে হবে। নতুবা দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষাগ্রহণকে অপ্রয়োজনীয় মনে করবেন অনেকে। গ্রামের শিক্ষার সাথে শহরের শিক্ষার যে গুণগত বিশাল পার্থক্য ঘটছে এখন, সেটিকেও আটকাতে হবে। মনে রাখতে হবে সাধারণ মানুষের সন্তানদের শিক্ষা ব্যবস্থার বাইরে ঠেলে দেয়া হলে প্রত্যাশিত উন্নয়নের দেখা পাওয়া কখনও সম্ভব হবে না।