সুদখোরদের যন্ত্রণায় ইউপি চেয়ারম্যামের মৃত্যু/ ৫ জনকে আসামী করে মামলা

স্টাফ রিপোর্টার
সুদখোরদের যন্ত্রণায় দিরাইয়ে রাজানগরের সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সৌম্য চৌধুরী (৬০) এর মৃত্যুর ঘটনায় ৫ জনকে আসামী করে মামলা দায়ের করা হয়েছে। সৌম্য চৌধুরীর স্ত্রী ইলা চৌধুরী বাদী হয়ে শুক্রবার রাতে এ ব্যাপারে দিরাই থানায় অভিযোগ দায়ের করেন।
অভিযোগে সৌম্য চৌধুরীর মৃত্যুর জন্য দিরাই উপজেলার আনোয়ারপুর গ্রামের মৃত আকবুল মিয়ার ছেলে হাবিবুর রহমান হবু (৪৬), দোওজ গ্রামের মৃত আলা উদ্দিনের ছেলে জসিম উদ্দিন (৪০), রাজানগর গ্রামের মৃত সুরেন্দ্র দাসের ছেলে স্বজল দাস (৫৫), মৃত রাম কুমার দাসের ছেলে পুতুল দাস (৫২) এবং মৃত কালিচরন দেবনাথের ছেলে অসিত দেব নাথ (৫০) কে আসামী করা হয়েছে।
থানায় লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, আসামীরা সংঘবদ্ধ, সুদখোর ও প্রতারক চক্রের লোক। আমার স্বামী একজন সহজ সরল লোক ছিলেন। দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থাকাকালে তিনি সুনামের সাথে দায়িত্ব পালন করেছেন। চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পর আসামীরা আমার স্বামীর সাথে সম্পর্ক গড়ে তোলে এবং সেই সুবাধে বিভিন্ন সময় আমাদের বাড়িতে আসা যাওয়া করত। আমার স্বামীর আর্থিক সমস্যা দেখা দিলে হাবিবুর রহমান হাবিব ও জসিম উদ্দিনের কাছ থেকে কিছু টাকা কর্জ বা হাওলাত আনেন। এসময় তারা আমার স্বামীর কাছ থেকে ব্যাংকের চেকের খালি পাতায় স্বাক্ষর নেয়। পরবর্তীতে এরা আসামী কর্জের টাকাকে সুদের টাকা বলে প্রচার করে এবং আমার স্বামীর স্বাক্ষর করা খালি চেকে ইচ্ছামত টাকার অংক বসিয়ে আদালতে চেক ডিসঅনার মামলা করে। মামলা চলা অবস্থায় দিরাই পৌরসভার মেয়র মোশাররফ মিয়ার মধ্যস্থতায় বিষয়টি নিষ্পত্তি হয় এবং সিদ্ধান্ত হয় আসামীরা আদালত থেকে মামলা উঠিয়ে আনবে। কিন্তু হাবিবুর রহমান ও জসিম উদ্দিন সুকৌশলে মামলা না উঠিয়ে আমার স্বামীর বিরুদ্ধে স্বাক্ষী দেওয়ায়, আদালত আমার স্বামীকে সাজা প্রদান করেন। এরপর থেকে আমাদের বাড়িঘরসহ যাবতীয় সম্পত্তি তাদের নামে রেজিস্ট্রি করে দেয়ার জন্য চাপ দিতে থাকে। না দিলে পুলিশে ধরিয়ে দিয়ে আমার স্বামীর মান সম্মান নষ্ট ও হত্যার হুমকী দেয়। ঘটনার কিছুদিন আগে মামলায় উল্লিখিত ৫ আসামী আমাদের বাড়িতে এসে হুমকী দিয়ে বলে, টাকা না দিতে পারলে বিষ খাইয়া মরিস না কেন। আসামীদের এরূপ কর্মকা-ে আমার স্বামী মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন। ঘটনার আগের দিন আমার স্বামীকে পুলিশে ধরিয়ে দেয়ার চেষ্টা করে। বিষয়টি টের পেয়ে আমার স্বামী সিলেটে যাবেন বলে বাড়ি থেকে বের হন। এরপরের রাতে সংবাদ পাই মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ থানা পুলিশ কমলগঞ্জ উপজেলার একটি সড়কের পাশ থেকে আমার স্বামীকে অসুস্থ অবস্থায় উদ্ধার করেছে। এরপর হাসপাতালে নিয়ে গেলে ডাক্তার আমার স্বামীকে মৃত ঘোষণা করেন। আমার স্বামী হাবিবুর রহমান ও জসিম উদ্দিনের মানসিক অত্যাচার ও নির্যাতনে বিষ খেয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে জানতে পারি। তিনি মৃত্যুর আগে ফেইসবুকে আত্মহত্যার কারণ সম্পর্কে স্ট্যাটাস দিয়ে গেছেন।
দিরাই থানার ওসি মুক্তাদীর আহমদ বললেন, ইলা চৌধুরী’র লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
প্রসঙ্গত, গত ৩ জুন শনিবার রাতে দিরাই উপজেলার রাজানগর ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান সৌম্য চৌধুরী (৬০) কে অনেকটা অচেতন অবস্থায় মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ-শ্রীমঙ্গল রোডের ফূলবাড়িয়া এলাকা থেকে পুলিশ উদ্ধার করেছিল। রাতেই মৌলভীবাজার হাসপাতালে মারা যান তিনি। মৃত্যুর আগে তিনি তার নিজের ফেসবুক আইডিতে দিরাইয়ে কিছু মানুষের নামোল্লেখ করে লিখেছেন, ‘সুদখোরদের যন্ত্রণায় এই পথ বেছে নিলাম আমি।’
এলাকাবাসি বলছেন, বিখ্যাত জমিদার পরিবারের সন্তান সৌম্য চৌধুরী। তার জেঠা সুধির কুমার চৌধুরী জমিদার ছিলেন। সৌম্য চৌধুরী চেয়ারম্যান থাকাকালীন সময়ে বিভিন্ন সরকারি সহযোগিতার সুষ্ঠু বণ্টন ও মানুষের পাশে থেকে কাজ করেছেন। সুদখোর সিন্ডিকেট চক্রের শিকার হয়ে তিনি বাড়ি জমি বিক্রি করে দেনা পরিশোধ করেও রেহাই পান নি। সুদখোররা স্টাম্প পেপার ও খালি চেকের পাতায় স্বাক্ষর নিয়ে মনগড়া টাকা বসিয়ে মানসিক নির্যাতন করেছে তাকে। এই নির্যাতন সইতে না পেরে আত্মহনন করেছেন তিনি।