স্বাধীনতার চেতনার ভিত্তিতে গড়ে উঠুক জাতীয় একতা

মহান স্বাধীনতার ৪৭তম বার্ষিকী আজ। ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মাহুতি, দুই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি আর সুদীর্ঘকালের আন্দোলন-সংগ্রামের ফসল এই স্বাধীনতা। বাঙালি জাতির সর্বকালের শ্রেষ্ঠ নেতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সুযোগ্য নেতৃত্বে হাজার বছরের পরাধীনতার শিকল ছিড়ে এই জাতি পৌঁছেছিলো স্বাধীনতার সুবর্ণ বন্দরে। জাতীয় ইতিহাসের এমন এক গৌরবান্বিত দিনে আমরা শ্রদ্ধাবনত চিত্তে স্মরণ করছি বীর শহীদানদের, যারা আহত হয়েছেন সেই বীর মুক্তিযোদ্ধাদের, জীবন বাজি রেখে যারা যুদ্ধ ময়দানে সন্মুখ সমরে অংশ নিয়েছিলেন জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান সেই অকুতোভয় মুক্তিযোদ্ধাদের। বঙ্গবন্ধুসহ যুদ্ধকালীন মুজিবনগর সরকার, ভারতের প্রধানমন্ত্রী শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধী ও ভারতীয় সেনাবাহিনিসহ সারা বিশ্বে যারা আমাদের স্বাধীনতা যুদ্ধকে সমর্থন দিয়েছিলেন সকলের প্রতি রইলো আমাদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন।
যেকোন জাতির নিকট তার সবচাইতে মূল্যবান বিষয় হলো স্বাধীনতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতিতে বহু দেশ বিনা রক্তপাতে স্বাধীনতা লাভ করতে সক্ষম হয়েছিল। দুর্ভাগ্যবশত ওই সময় আমাদের ভূখ-ে তথাকথিত স্বাধীনতার যে বিষয়টি বৃটিশ উপনিবেশ চাপিয়ে দিয়েছিলো সেটি ছিলো বৃটিশ অধীনতার পরিবর্তে পাকিস্তানি অধীনতার ভিতরে ঢুকে যাওয়া। ফলে ১৯৪৭ সনের দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে গঠিত বিকলাঙ্গ পাকিস্তান রাষ্ট্র বাঙালির স্বাধীন ইচ্ছা ও সংস্কৃতিকে ধারণ করতে ব্যর্থ হয়। পাকিস্তান সৃষ্টির জন্মলগ্ন থেকেই শুরু হয় এই জাতির প্রকৃত স্বাধীনতা লাভের আরেক দুর্মর প্রয়াস। ১৯৪৮ সনে ভাষার প্রশ্নে উর্দুভাষাভিত্তিক পাকিস্তান রাষ্ট্রের সাথে বাঙালির যে সংগ্রাম শুরু হয় ধাপে ধাপে সেটিই উন্নীত হয় স্বাধীনতার সংগ্রামে। এই দেশের সৌভাগ্য যে এমন আন্দোলন-সংগ্রাম একজন বঙ্গবন্ধুকে তৈরি করতে সমর্থ হয়েছিলো। জাতিকে একতাবদ্ধ করার কাজে তিনি পথপ্রদর্শকের ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর সম্মোহনী ক্ষমতা বঞ্চিত জাতিকে এক কঠিন সংগ্রামে একাট্টা হয়ে দাঁড়িয়ে যেতে প্রেরণা জুগিয়েছিলো। বঙ্গবন্ধু পেয়েছিলেন তাজউদ্দিন, সৈয়দ নজরুল ইসলামসহ এক দল নিবেদিত সহকর্মী যারা রাজনৈতিকভাবে ছিলেন ভীষণ প্রজ্ঞাবান। এর সবকিছুর যোগফল হলো একাত্তরের স্বাধীনতা। একটি দেশের প্রশিক্ষিত ও শক্তিশালী সামরিক বাহিনির বিরুদ্ধে প্রায় নিরস্ত্র বাঙালি সাহসের অগ্নিশিখায় জ্বলে উঠেছিল।
আজ স্বাধীনতা অর্জনের সাতচল্লিশ বছরে এসে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, স্বাধীনতার যেসব আদর্শ আমাদের মনে গাঁথা ছিলো সেগুলো কি বাস্তবায়িত হয়েছে? সবকিছু অর্জিত হয়ে গেছে বললে সত্যের অপলাপ হবে। যদি হতো তাহলে আজকের বাংলাদেশ তথাকথিত জঙ্গি হামলায় বিপর্যস্থ হতো না। দুর্নীতির মৃগয়াক্ষেত্রে পরিণত হতো না। স্বাধীন দেশে স্বাধীনতা বিরোধীদের এত দাপুটে অবস্থান দেখা যেত না। আজ সরকার এইসব দুষ্টক্ষতের আঘাতে এক কঠিন সময় অতিক্রম করছে। একাত্তরে যে চেতনার প্রদীপ্ত শিখা জ্বলে উঠেছিলো আজ একই চেতনার বিস্তৃতি ভীষণ জরুরি। নতুবা একাত্তরের যাবতীয় অর্জন ভূলুণ্ঠিত হবে। ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত আর অনৈতকতার যে বিষবৃক্ষ আজ ডাল-পালা মেলেছে বাংলার সবুজ আকাশে সেগুলোকে সমূলে উপড়ে ফেলতে না পারলে গ্রাস করবে পুরো জাতিসত্বাকে। জাতির আজ বিভাজনরেখা দূর করে ঐক্যবদ্ধ হওয়া অস্তিত্বের জন্য অপরিহার্য। ভেদাভেদ ভুলে, রাজনৈতিক সংকীর্নতা পরিহার করে মৌলিক কিছু বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছানো এই দেশের আজ সবচাইতে বড় চাহিদা। রাষ্ট্র পরিচালনায় নিয়োজিত সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোকে ওই একতা গড়ে তুলতে রাখতে হবে দায়িত্বশীল ভূমিকা। নতুবা কঠিন পরিস্থিতি মোকাবিলায় যদি কোন ব্যত্যয় ঘটে তার দায় নিতে হবে সকলকে। তাই আজকের স্বাধীনতা দিবসের আহ্বান হোক জাতীয় একতার, স্বাধীনতার চেতনার ভিত্তিতে।