হাওরে লোকউদ্যোগ সম্প্রসারিত হোক

জামালগঞ্জের পাগনার হাওরে জমে থাকা পানি নামানোর জন্য কৃষকরা স্বউদ্যোগে কয়েকটি স্থানে বাঁধের মাটি কেটে দিয়েছেন বলে গতকাল দৈনিক সুনামগঞ্জের খবরে প্রকাশিত একটি সংবাদ থেকে জানা যায়। শুক্রবার ৬০ জন কৃষক পানি নিষ্কাশনের রাস্তা তৈরির জন্য হাওরে স্বেচ্ছাশ্রম দিয়েছেন। তারা সরকারি পরিকল্পনা কিংবা বরাদ্দের জন্য মুখাপেক্ষী থাকেননি। কৃষকরা দেখলেন, তাদের হাওরের পানি সময়মত না নামার কারণে বীজতলা তৈরি করতে পারছেন না, বোরো চাষাবাদ বিলম্বিত ও বিঘিœত হতে পারে এজন্য। তারা খুঁজে বের করলেন হাওরের পানি কেন নামছে না তার কারণ। পর্যবেক্ষণ করে তারা জানলেন, হাওরের ডালিয়া ও করটিয়া বাঁধ পানি আটকে রাখছে। তারা ওই বাঁধে প্রয়োজনীয় পরিমাণ অংশ কেটে পানি নামার রাস্তা করে দিলেন। কৃষকরা বলছেন এর ফলে দুই তিন দিনের মধ্যেই হাওরের পানি নেমে যাবে এবং তারা বীজতলা তৈরির কাজ শুরু করতে পারবেন। এই যে কৃষকরা নিজেদের সমস্যাটি নিজেরা সমাধান করলেন তাই আসলে হাওর উন্নয়নের মূল দর্শন হওয়া উচিৎ ছিল। সামান্য কোন কাজের জন্য সরকারের মুখাপেক্ষী থাকা কোন কাজের কথা নয়। যে কাজটি সহজেই করা সম্ভব তার জন্য সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষা করলে বিড়ম্বনা বাড়তে পারে। আমাদের একটি জাতীয় চরিত্র দাঁড়িয়ে গেছে যে, সকল কাজই সরকার করে দিবে। এতে করে মানুষের সহজাত যে ক্ষমতা সেটি মুখ থুবড়ে পড়ছে। পাগনার হাওরের কৃষকরা সীমিত আকারে নিজেদের ভিতরকার সেই ক্ষমতার প্রকাশ ঘটালেন যেটি আশাব্যঞ্জক। বিভিন্ন হাওরে এই দৃষ্টান্ত অনুসরণ করা যেতে পারে পুরো ফসল মৌসুমে। গতবার যখন একের পর এক হাওরের ফসল ডুবছিল তখন প্রতিরোধের এক অনন্য কীর্তি স্থাপন করেছিলেন বৃহৎ শনি ও পাগনার হাওরের কৃষকরা। রাত দিন স্বেচ্ছাশ্রমে, কিছু সরকারি সহায়তায় সংগ্রামী কৃষকরা ওই দুইটি হাওর বেশ কয়েক দিন টিকিয়ে রাখতে সমর্থ হয়েছিলেন। আগে পিআইসি/ঠিকাদাররা সঠিক ভাবে কাজ করলে কৃষকদের এই উদ্যোগ ব্যর্থ হত না।
গতবারের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে কৃষকদের এখন থেকেই পূর্বপ্রস্তুতি নিয়ে রাখা উচিৎ। সরকার যতটুকু করার করবেন। সরকারি বরাদ্দের কাজ সঠিকভাবে হচ্ছে কিনা সেটি নজরদারি করার জন্য কৃষকরা নিজেদের উদ্যোগে বাঁধে বাঁধে স্বেচ্ছাসেবী টিম তৈরি করতে পারেন। এই টিমে যারা অন্তর্ভূক্ত থাকবেন তাদেরকে অবশ্যই এলাকার জমি মালিক হতে হবে এবং টিমের সকলকেই স্বেচ্ছাশ্রম দিতে আন্তরিক থাকতে হবে। সরকারি কর্মসূচীর সাথে কোন ক্লেশ নয় বরং সহায়ক শক্তি হিসেবে কাজ করবে এই কমিটি। আপৎকালীন সময়ে কোন জরুরি কাজের প্রয়োজন হলে, যে কাজে কোন ধরনের সরকারি বরাদ্দ নেই, সেখানে জমির মালিকরা আনুপাতিক হারে খরচ বহন স্বাপেক্ষে ওই টিম সেই কাজটি করে দিতে পারে। যারা জমির মালিক, যারা জনপ্রতিনিধি ও সমাজের জ্ঞানী শ্রেণি তাঁরা বিষয়টি ভেবে দেখতে পারেন। নিজের সম্পদ নিজে রক্ষা করা তথা নিজেদের অন্তর্গত বিশাল সৃজনি শক্তির বিকাশ সাধনের লক্ষ্য নিয়ে স্থানে স্থানে এই ধরনের লোকউদ্যোগ সম্প্রসারিত হোক এই আমাদের কামনা।