স্টাফ রিপোর্টার
১ মার্চ ভুট্টোর প্ররোচনায় ইয়াহিয়া একতরফাভাবে জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত করার প্রেক্ষিতে বঙ্গবন্ধু ঘোষিত অহিংস-অসহযোগ ইতিমধ্যে সর্বব্যাপী রূপ লাভ করে। ১৬ মার্চ একদিকে অসহযোগ আন্দোলনের সভা, সমাবেশ, মিছিল অন্যদিকে মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠক যেন সারাদেশকে আরও উত্তাল করে তোলে।
ঢাকায় প্রেসিডেন্ট ভবনে বেলা ১১টা থেকে দুপুর দেড়টা পর্যন্ত আড়াই ঘন্টাব্যাপী আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান প্রেসিডেন্ট আগা মোহাম্মদ ইয়াহিয়া খানের সাথে এক রুদ্ধদ্বার বৈঠকে মিলিত হন। শেখ মুজিবুর রহমান গাড়িতে কালো পতাকা উড়িয়ে এবং উইন্ড স্ক্রীনে গাঢ় সবুজের পটভূমিতে রক্তিম সূর্যের বুকে স্বর্ণালি মানচিত্র খচিত বাংলাদেশের স্বপ্নের পতাকা লাগিয়ে প্রেসিডেন্ট ভবনে যান। আলোচনা শেষে শেখ মুজিব প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে বের হয়ে অপেক্ষমাণ দেশী-বিদেশী সাংবাদিকদের জানান, আমি রাজনৈতিক সমস্যা সম্পর্কে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আলোচনা করেছি। এটা এক দুই মিনিটের আলোচনায় সমাধানের বিষয় নয়। আরো আলোচনা হবে। কাল সকালে আমরা আবার আলোচনায় বসবো। এর চেয়ে বেশী কিছু আমার বলার নেই।
প্রেসিডেন্ট ভবন থেকে নিজ বাসভবনে ফিরে বঙ্গবন্ধু দলের শীর্ষস্থানীয় সহকর্মীদের সাথে আলোচনায় বসেন। গভীর রাত পর্যন্ত এই আলোচনা চলে।
এদিন ঢাকা হাইকোর্ট প্রাঙ্গণে আইনজীবীদের এক সভায় বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রামে যে কোনো ত্যাগ স্বীকারের জন্য আইনজীবীরা শপথ গ্রহণ করেন। সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত এক প্রস্তাবে বলা হয়, জাতির প্রতি প্রদত্ত পবিত্র প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান ইচ্ছাকৃতভাবে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিদের নিকট ক্ষমতা হস্তান্তর বিলম্বিত করেছেন। প্রেসিডেন্ট তার প্রতিশ্রুতি পালনের উদ্দেশে নির্বাচনের অব্যবহিত পর জাতীয় পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করলে এতদিনে ক্ষমতা হস্তান্তরের কাজ সুসম্পন্ন হতো। সেনাবাহিনী কর্তৃক নিরস্ত্র জনগণের ওপর যে হত্যাযজ্ঞ চালানো হয়েছে, আমরা তার তীব্র নিন্দা জানাই। এক্ষণে যত দ্রুত সম্ভব বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব প্রদত্ত ৪টি শর্ত মেনে নেওয়ার জন্য প্রেসিডেন্টের প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানাচ্ছি।
বিকেলে শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন ও মুর্তজা বশীরের নেতৃত্বে চারু ও কারুকলা মহাবিদ্যালয়ের শিক্ষক-ছাত্রদের একটি মিছিল কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে স্বাধিকার আন্দোলনের কর্মীদের সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করে। সকালে বাংলা একাডেমীতে শিল্পী কলিম শরাফীর সভাপতিত্বে অসহযোগের সমর্থনে ব্রতচারী আন্দোলনের এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। অসহযোগের সমর্থনে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ‘বিক্ষুব্ধ শিল্পী সমাজ’ প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। বিকেলে বায়তুল মোকাররম প্রাঙ্গণে ডাক বিভাগের কর্মচারীরা এক সভা আহ্বান করে এবং বঙ্গবন্ধু নির্দেশিত কর্মসূচির সমর্থনে মিছিল বের করে।
কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সার্ভিসগুলোতে ফেডারেশনের উদ্যোগে পূর্ব পাকিস্তান সরকারি অর্থনীতিবিদ ও পরিসংখ্যানবিদ সমিতির এক সভায় বঙ্গবন্ধুর ঘোষণার প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন ব্যক্ত করা হয়। এ ছাড়াও এদিন চামড়া ব্যবসায়ী সমিতি, ইপি ওয়াপদা অফিসার সমিতি, ইপি মৎস্য উন্নয়ন সংস্থার কর্মচারী সমিতি, পূর্ব বাংলা বীমা সংস্থাগুলোর কর্মচারী সমিতি, নোয়াখালী মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন, কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সার্ভিস ও পেশাদার সংস্থাগুলোর ফেডারেশনের স্টিয়ারিং কমিটি প্রভৃতি সংস্থার পৃথক পৃথক সভায় আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার এবং বঙ্গবন্ধু ঘোষিত কর্মসূচি মেনে চলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। টঙ্গী ও নারায়ণগঞ্জে বঙ্গবন্ধুর অসহযোগ কর্মসূচির সমর্থনে শ্রমিকদের বিশাল মিছিল বের হয়।
এদিন ডক শ্রমিকরা শীতলক্ষ্যায় এক বিশাল নৌ-মিছিল বের করে। দুপুরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ইস্টার্ন ফেডারেল কর্মচারী ইউনিয়ন বীমা কর্মচারী সমিতির উদ্যোগে এক সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় গৃহীত প্রস্তাবে বলা হয়, বাংলার মুক্তির জন্য শেখ মুজিবের যে কোনো সিদ্ধান্ত মেনে চলব এবং স্বাধিকার অর্জনে যে কোনো প্রকার ত্যাগের জন্য প্রস্তুত থাকব। আওয়ামী লীগের সাহায্য তহবিলে মুক্তহস্তে দান করার জন্য দেশের সব বীমা প্রতিষ্ঠানের প্রতি আহ্বান জানানো হয়। এদিন ঢাকা মেডিকেল ও আইপিজিএমের নার্সিং স্টাফরা আওয়ামী লীগের সাহায্য তহবিলে একদিনের বেতন প্রদানের ঘোষণা দেন।
এদিন পূর্ব পাকিস্তান অভ্যন্তরীণ নৌ-চলাচল কর্তৃপক্ষের এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আওয়ামী লীগের নির্দেশক্রমে প্রত্যহ বেলা ১০টা থেকে বেলা ১টা পর্যন্ত আইডব্লিউটিএর ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সব উন্নয়ন শাখাসহ নির্দেশিত অন্যান্য দপ্তর খোলা থাকবে বিধায় সংশ্নিষ্ট দপ্তরগুলোর সবাইকে উক্ত সময়ে কাজে যোগদানের জন্য অনুরোধ করা যাচ্ছে। আওয়ামী লীগের নির্দেশক্রমে ঘূর্ণিদুর্গত এলাকায় সাহায্য ও পুনর্বাসন কার্য ত্বরান্বিত করার জন্য সংশ্নিষ্ট দপ্তর খোলা রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
ভারত সরকার আজ তার ভূখন্ডের ওপর দিয়ে সমস্ত বিদেশী বিমানের পূর্ব পাকিস্তানে যাতায়াতের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বিদেশী বিমানে পূর্ব পাকিস্তানে সৈন্য পরিবহন বন্ধ করার জন্যই এ ব্যবস্থা নেয়া হয়। ময়মনসিংহে এক জনসভায় ন্যাপ প্রধান মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী স্বাধীন বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর পদ অলঙ্কৃত করার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের প্রতি আহ্বান জানান।
- দেশকে বাঁচাতে হলে প্লাস্টিক পণ্য বর্জন করতে হবে
- শ্রীরামকৃষ্ণের আবির্ভাব তিথি উদযাপন উপলক্ষে বস্ত্র ও স্কুল ব্যাগ বিতরণ


