বিশেষ প্রতিনিধি
প্রায় ৪০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত আড়াই’শ শয্যার ৮ তলা হাসপাতাল ভবন ত্রুটি বিচ্যুতির জন্য গ্রহণ করছেন না সুনামগঞ্জ স্বাস্থ্য বিভাগ। দুই মাস ধরেই ভবনের প্রধান ফটকে তালা ঝুলছে। সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগ ২ মাস আগে ভবন বুঝিয়ে নেবার চিঠি দিলেও সিভিল সার্জন জানিয়েছেন,‘ভবনের জরুরি কাজ সম্পন্ন না হলে এবং যেসব ত্রুটি রয়েছে সেগুলোর সমাধান না করলে এই ভবন বুঝে নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়।’
১০০ শয্যার সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালকে ২৫০ শয্যায় উন্নীত করতে ২০১৩ সালে ৭ তলা ভবন নির্মাণ কাজ শুরু হয়েছিল। ঢাকার জামাল এ- কোম্পানী – ইসলাম কর্পোরেশন কনসোর্টিয়াম এই ভবন নির্মাণের ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। প্রথম কার্যাদেশে ভবনের জন্য ৩২ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। পরে পুনঃ প্রাক্কলনে আরও একতলা যোগ হওয়ায় ৮ কোটি বেড়ে ৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। ২০১৭ সালে এই ভবনের কাজ শেষ হবার কথা ছিল। কিন্তু ২০১৮ সালের ১৪ মে তারিখেও কিছু কাজ বাকী রয়েছে, আবার কিছু ত্রুটি বিচ্যুতিও হয়েছে দাবি করেছেন সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আশুতোষ দাস। নতুন এই ভবনটিতে কী কী ত্রুটি হয়েছে, তা নির্ণয়ের জন্য ডাক্তারদের দিয়ে ১০ সদস্যের পর্যবেক্ষক টিমও গঠন করে দেওয়া হয়। এই টিম প্রায় এক মাস কাজ করেছে। ১৯ হাজার বর্গফুটের প্রত্যেক তলার সব কয়টি কক্ষ পর্যবেক্ষণ করেছেন।
পর্যবেক্ষণ টিমের সদস্য সুনামগঞ্জ সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. রফিকুল ইসলাম বলেন,‘আধুনিক এই ভবনটিতে অটোক্লেব কক্ষ করা হয়নি। ৮ম তলার ৩৭ টি ক্যাবিনে হাত ওঠালে সিলিং ফ্যান হাতে লেগে যায়। বেলকনিগুলোতে গ্রীল দেওয়া হয়নি। একজন অপ্রকৃতস্থ রোগী, কিংবা শারীরিক যন্ত্রণায় অতীষ্ট একজন রোগী উপর থেকে পড়ে আত্মহত্যা করতে পারে। এসব ত্রুটি দেখার জন্য সিভিল সার্জন মহোদয়ের পক্ষ থেকে ১০ সদস্যের পর্যবেক্ষক টিম করে দেওয়া হয়েছিল। আমরা লিখিতভাবে তা সিভিল সার্জনকে জানিয়েছি।’
পর্যবেক্ষক টিমের চেয়ারম্যান ডা. বিশ্বজিৎ গোলদার বলেন,‘অটোক্লেব বা জীবানুমুক্ত কক্ষ হাসপাতালের জন্য জরুরি। এটি প্রাথমিক ডিজাইনে ছিল। আইসিইউ-সিসিইউ কক্ষ করতে গিয়ে অটোক্লেব কক্ষ বাদ পড়ে যায়। আইসিইউ-সিসিইউ কক্ষও উন্নতমানের হয়নি। অন্যান্য কিছু বিষয় আছে সংশোধনযোগ্য। নির্মাণকারী কর্তৃপক্ষ এসব ত্রুটি বা প্রয়োজনীয় কাজ করে দেবার জন্য লিখিত দিলে আমরা ভবন বুঝে নিতে পারি।’
সুনামগঞ্জের সিভিল সার্জন ডা. আশুতোষ দাস বলেন,‘একতলায় ওয়ার হাউস, দুই তলায় কিচেন, তিন তলায় প্রশাসনিক ভবন। উপরের ৮ তলায় রোগি কেবিনের ফ্লোর, অথচ ৮ তলার উচ্চতা ১২ ফুটের স্থলে করা হয়েছে ১০ ফুট। বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষ বলছেন ডিজাইন ১০ ফুটের এজন্য ১০ ফুট উচ্চতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ঐ কক্ষগুলোর ্েফ্লার থেকে হাত দিয়ে ফ্যান ধরা যায়। ডাক্তারদের পর্যবেক্ষক দল এগুলো সঠিক মনে করেননি। তারা সুপারিশ করেছেন আমাদের বর্তমান আলাদা ভবনের রান্নাঘরকে মেরামত করে দেবার জন্য। রান্নাঘর ওখানে থাকলে নতুন ভবনের রান্নাঘরকে অটোক্লেব কক্ষ করা যাবে। ডিজাইন অনুযায়ী আরও কিছু কাজ করা হয়নি। যেমন স্টোর রুম আছে ডিজাইনে। তারা করেননি। এরপরও ভবন আমরা বুঝে নিতে চাই। ভবন বুঝে না নিলে অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে যাবে। তবে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান ও বাস্তবায়নকারী কর্তৃপক্ষকে লিখিত দিতে হবে, যেসব কাজ করা হয়নি তারা করে দেবে, তাহলেই ভবন বুঝে নেওয়া হবে।’
সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রসেনজিৎ পাল বলেন,‘স্থাপত্য অধিদপ্তরের নকশা অনুযায়ী আমরা কাজ বাস্তবায়ন করেছি। চুক্তিমূল্যের ভেতরে যা কাজ ছিল, সবই করা হয়েছে। ব্যবহারকারী কর্তৃপক্ষ আরও কিছু কাজ করার কথা বলেছেন, সেগুলোও যৌক্তিক দাবি। এসব কাজের প্রাক্কলন তৈরি করে উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে পাঠানো হয়েছে। ২ মাস আগে ভবন বুঝে নেবার জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে। ভবন বুঝে না নিলে ব্যবহার না করায় অনেক কিছুই নষ্ট হয়ে যেতে পারে।’
সুনামগঞ্জ গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আবিল আয়ান বলেন,‘স্থাপত্য অধিদপ্তরের নকশা অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন করেছি আমরা। কাজ চলমান অবস্থায় ডিজাইন আপগ্রেড করতে সমস্যা ছিল না। এখন করা অসম্ভব। ভবন নির্মাণে কোন অনিয়ম হয়নি। শীঘ্রই ভবন হস্তান্তর হয়ে যাবে।’


